
ভোরের আলো ফোটার আগেই জমে ওঠে চারার হাট। সারি সারি সাজানো দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফলজ, বনজ, ঔষধি ও ফুলের চারা। ভোরেই পছন্দের চারা কিনে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ছুটে যান দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন হাটবাজারে। আর বিকেলে স্থানীয় ক্রেতারা আসেন বাড়ির আঙিনা কিংবা বাগান সাজানোর জন্য পছন্দের চারা কিনতে। এমন কর্মচঞ্চল পরিবেশ এখন খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের গদাইপুর বাজার ও আশপাশের নার্সারিগুলোতে।
সরেজমিনে স্থানীয় নার্সারি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গদাইপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৫০০টি বাণিজ্যিক নার্সারি রয়েছে। এসব নার্সারিতে সারা বছরই চারা উৎপাদন ও পরিচর্যা করা হয়। সপ্তাহের শুক্রবার, সোমবার ও বুধবার গদাইপুরে নিয়মিত হাট বসে। তবে হাটের নির্দিষ্ট দিন ছাড়াও প্রতিদিন চলে চারা ও কলমের বেচাকেনা।
বর্ষা মৌসুম বৃক্ষরোপণের উপযুক্ত সময় হওয়ায় এ সময়ে চারার চাহিদা ও বিক্রি বেড়ে যায়। নার্সারি মালিকেরা ভোরে গাছ থেকে চারা তুলে হাটে নিয়ে আসেন। দিনের শুরুতেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা চারা কিনে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার বাজারে সরবরাহ করেন।
গদাইপুরের নার্সারিগুলোতে দেশি জাতের আম, কাঁঠাল, জাম, জামরুল, লিচু, কদবেল, কুল, পেয়ারা, বাতাবি লেবু, মাল্টা, কমলা ও নারিকেলের পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে নানা বিদেশি জাতের ফলের চারা। এর মধ্যে মিয়াজাকি, কিং অব চাকাপাত, ডগ মাই, বেগুনি ম্যাঙ্গো, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিউ জায় ও চিংমাই জাতের আমের চারার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। এ ছাড়া রয়েছে রামবুটানসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফল এবং নানা প্রজাতির ফুলের চারা। জাত, আকার ও মানভেদে এসব চারার দাম ২০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। বিদেশি জাতের নারিকেলের চারা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকায়। অন্যদিকে, বড় আকারের মাল্টা ও কমলালেবুর চারার দাম উঠছে ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
পাইকগাছা উপজেলা নার্সারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সরদার বলেন, গদাইপুর এলাকায় প্রায় ৫০০টি নার্সারি রয়েছে। এসব নার্সারিতে উৎপাদিত চারা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এখানকার চারা যায়।
সমিতির সভাপতি আছাদুল ইসলাম বলেন, করোনাকালে কয়েক বছর চারার বিক্রি কমে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে আবার বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। নার্সারি ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারণ করতে মালিকদের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে উদ্যোক্তারা নতুনভাবে বিনিয়োগ করতে পারবেন এবং ব্যবসার পরিধিও বাড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. একরামুল হোসেন বলেন, কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করে নার্সারি পরিচালনা করা হলে আরও মানসম্মত চারা উৎপাদন সম্ভব। পাশাপাশি নার্সারি মালিকদের সহজ শর্তে বা কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে তাঁরা এ ব্যবসায় আরও লাভবান হতে পারবেন।
নার্সারি মালিকেরা জানান, ভোরে চারা কেনাবেচার অন্যতম কারণ হলো সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই চারা গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। এতে পরিবহনের সময় চারার ক্ষতি কম হয় এবং সতেজতা বজায় থাকে। গদাইপুরের নার্সারিগুলোতে বিভিন্ন জাতের মানসম্মত চারা পাওয়া যাওয়ায় পাইকগাছার পাশাপাশি কয়রা, আশাশুনি, দাকোপসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারাও এখানে আসেন।
স্থানীয়দের মতে, একই জায়গায় বিভিন্ন জাত, আকার ও দামের চারা পাওয়ার সুবিধায় গদাইপুরের চারার হাট দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বর্ষা মৌসুমে ভোর থেকে জমে ওঠা এ হাট শুধু চারা কেনাবেচার কেন্দ্রই নয়, এলাকার বহু মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যথাযথ সহায়তা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে গদাইপুরের নার্সারি ব্যবসা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ