
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের আশপাশে বাড়ছে হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসা। গত সাত-আট বছরে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২১টি রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। এর বাইরে আরও অন্তত ১০টি রিসোর্ট নির্মাণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত সুন্দরবনের আশপাশে এসব স্থাপনা নির্মাণ ও পর্যটন কার্যক্রম নিয়ে নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে।
সুন্দরবনের সীমানা থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ১৯৯৯ সালে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ওই এলাকায় শিল্প ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ। পরিবেশের ক্ষতি হবে না—এমন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা রিসোর্টগুলোর মালিকদের কেউই সেই অনুমতি নেননি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন অনুযায়ী রিসোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে নিবন্ধন নেওয়াও বাধ্যতামূলক। কিন্তু খুলনায় নিবন্ধিত কোনো রিসোর্ট বা কটেজ নেই বলে তথ্য অধিকার আইনে দেওয়া এক আবেদনের জবাবে জেলা প্রশাসনের তথ্য শাখা জানিয়েছে। সাতটি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে, যেগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন।
সম্প্রতি সুন্দরবনের আশপাশের রিসোর্ট এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা না থাকায় কোথাও গাছ কেটে, কোথাও জলাভূমি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অনেক রিসোর্টকে ‘ইকো রিসোর্ট’ বলা হলেও কংক্রিটের স্থাপনার ওপর বাঁশ, কাঠ ও গোলপাতা ব্যবহার করে সেগুলো সাজানো হয়েছে। চিলা, চাঁদপাই ও সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ এলাকায় কংক্রিটের স্থাপনাও তৈরি হচ্ছে।
খুলনার দাকোপের ঢাংমারী এলাকায় সুন্দরবনের ডলফিন অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ঢাংমারী খাল ঘিরেই গড়ে উঠেছে প্রায় ১০টি রিসোর্ট। এই এলাকায় গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিনের বিচরণ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন অসংখ্য ট্রলার ও নৌযান পর্যটক নিয়ে খাল দিয়ে চলাচল করে। পর্যটকদের অনেকে খাল ও বনের আশপাশে উচ্চ শব্দে হৈ-হুল্লোড় করেন। বিভিন্ন রিসোর্টে জেনারেটর ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র চালানোর পাশাপাশি পর্যটকদের ব্যবহৃত পানি বনের খালে ফেলা হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান সেন্টমার্টিনের চেয়েও বেশি স্পর্শকাতর ও জটিল। বনঘেঁষে একের পর এক রিসোর্ট এবং অতিরিক্ত পর্যটকের আনাগোনা, চিৎকার-চেঁচামেচিতে বনের বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। পর্যটকের বর্জ্য খাল দিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করায় পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানান তিনি।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, রিসোর্টগুলোর কারণে বনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। পর্যটকরা অনুমতি ছাড়া বনে প্রবেশ করেন। অতিরিক্ত শব্দ ও আলো এবং পর্যটকের ফেলে যাওয়া বর্জ্য বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। তবে রিসোর্টগুলো সুন্দরবনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে তৈরি হওয়ায় বন বিভাগের তেমন কিছু করার নেই বলে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বনঘেঁষে বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৯ সালে। পরে ২০১৬ সালে খুলনার দাকোপের ঢাংমারী গ্রামে ‘গোল কানন’ নামে একটি ইকো রিসোর্ট তৈরি হয়। এরপর পর্যটন ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়তে থাকে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এমন অনেক ব্যবসায়ী এখন সুন্দরবন এলাকায় বিনিয়োগ করছেন। তাদের কারও সেন্টমার্টিন, বান্দরবান বা হাওর এলাকায় পর্যটন ব্যবসাও রয়েছে।
সেন্টমার্টিনের ‘মার্টিন ভিউ’ রিসোর্টের সঙ্গে যুক্ত জাকারিয়া শাওন পরে সুন্দরবনের ঢাংমারী খালের পাশে ‘জঙ্গলবাড়ি’ নামে রিসোর্ট তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, নানা বিধিনিষেধের কারণে সেন্টমার্টিনের রিসোর্ট ভালো চলছিল না। সুন্দরবন নিয়ে পর্যটকদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে ভালো। তার দাবি, আইন মেনেই পরিবেশগত সমীক্ষা সম্পন্ন করে রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে এবং নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
এদিকে সুন্দরবনের ঢাংমারী, বন লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ ও চাঁদপাই এলাকায় আরও ১০টি রিসোর্ট নির্মাণের প্রক্রিয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটি স্থাপনার নির্মাণকাজ চলতে দেখা গেছে। আরও সাতটি স্থানের জন্য জমি চূড়ান্ত করে সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারাও ঢাংমারী খালের আশপাশে নতুন রিসোর্ট নির্মাণের কথা জানিয়েছেন। তবে এসব স্থাপনা বনের সীমানার বাইরে হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তা।
রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের জন্য রাতে বারবিকিউ পার্টি, গান-বাজনার আয়োজন করা হচ্ছে। আবার বিভিন্ন রিসোর্টের কর্মীরা পর্যটকদের বনে ও খালে ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অথচ সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের পুরো এলাকাই সংরক্ষিত বন এবং অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু রিসোর্টে আসা অনেক পর্যটক অবৈধভাবে বনে ও খালে প্রবেশ করছেন।
পরিবেশ আইনে ইসিএ এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি অযাচিতভাবে গাছ কাটাও নিষিদ্ধ। তবে সুন্দরবনের পাশে কয়েকটি রিসোর্ট নির্মাণের ক্ষেত্রে গাছ কাটার এবং কোথাও পুকুর ভরাটের অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক পারভেজ আহম্মেদ জানান, সুন্দরবনের ইসিএ এলাকায় অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট স্থাপন ও পরিচালনার বিষয়ে ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা জবাবও দিয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুন্দরবন রক্ষা ও পর্যটনের বিকাশকে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখা হয় না। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটনের বিকাশ প্রয়োজন। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন সুবিধাও প্রয়োজন। তবে এসব কার্যক্রম অবশ্যই বিদ্যমান আইন, পরিবেশগত বিধিবিধান ও ইসিএর নীতিমালা অনুসরণ করে করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবন ঘিরে পর্যটন ব্যবসার বিকাশের সুযোগ রয়েছে। তবে বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করে সুন্দরবন ঘিরে পর্যটন ব্যবসার প্রসার ঘটাতে হবে। রিসোর্ট তৈরির আগে ও পরে বনের ওপর এর প্রভাব নিরূপণ করে সেই অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়ন ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
পর্যটন খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, নৌযানে পর্যটনের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে বিভিন্ন নীতিমালা করা হয়েছে। বনের ভেতরে নির্দিষ্ট আয়তনের লঞ্চ ও নির্দিষ্ট সংখ্যার বাইরে পর্যটক প্রবেশ করতে পারেন না। আগে থেকে অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করতে হয় এবং সব এলাকায় যাওয়ার সুযোগ নেই। তাদের মতে, রিসোর্টের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নীতিমালা করা প্রয়োজন। এতে যত্রতত্র রিসোর্ট নির্মাণ কমবে এবং বিদ্যমান রিসোর্টগুলোও পরিবেশগত নিয়ম মেনে পরিচালিত হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, রিসোর্টগুলোর নেতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, তেমনি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এসব রিসোর্টের মাধ্যমে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে স্থানীয় গ্রামগুলোর অর্থনীতিও বড় হচ্ছে। তবে সুন্দরবনের ওপর রিসোর্ট ব্যবসার সামগ্রিক প্রভাব কতটা পড়ছে, তা নিরূপণে আরও গবেষণা ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি