
বাংলাদেশের সাবেক অফ স্পিনার ফাহিম মুনতাসির ৪৫ বছরের জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন ক্রিকেট মাঠে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে শুরু করে ঘরোয়া ক্রিকেট, প্রথম শ্রেণি ও ‘এ’ দলের হয়ে খেলার পর জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেছেন তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে। তবে এত দীর্ঘ ক্রিকেটজীবন পার করেও তিনি জানতেন না, জন্ম থেকেই তাঁর শরীরে একটি কিডনি নেই।
২০০২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বশেষ ম্যাচ খেলা ফাহিম ২১ বছর পর বিষয়টি জানতে পারেন। ২০২৩ সালে ৪৩ বছর বয়সে ভারতের দিল্লিতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে আলট্রাসনোগ্রামের সময় চিকিৎসকের সন্দেহ হয়, তাঁর বাঁ পাশে কোনো কিডনি নেই।
পরে পরীক্ষায় বিষয়টি নিশ্চিত হয়। চিকিৎসকেরা জানান, জন্মগতভাবেই একটি কিডনি নিয়ে জন্মেছেন ফাহিম। তবে একটি কিডনি নিয়ে সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব হলেও থাকা কিডনিটিকে সুস্থ রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়।
ক্রিকেটে ফাহিমের পথচলা
ক্রিকেটে ‘সুমিত’ নামে পরিচিত ফাহিম ১৯৯৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যুব দলের সদস্য ছিলেন। পরের বছর তিনি যুব দলের নেতৃত্বও পান।
১৯৯৮ সালের মার্চে বিসিবি একাদশের হয়ে ভারত সফরে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। ১৯৯৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন। সেই ম্যাচে ২৬ ওভার বোলিং করে ১১৬ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি।
২০০১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় ফাহিমের। পরের বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকায় টেস্ট অভিষেক হয় তাঁর। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে খেলেছেন তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে।
সব মিলিয়ে ফাহিম ৩৭টি প্রথম শ্রেণির ও ৩৩টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন। ক্রিকেট ছাড়ার পর কোচিংয়েও যুক্ত হন এবং দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব মোহামেডানের মতো দলে কোচ হিসেবে কাজ করেছেন।
এক কিডনি নিয়ে ক্রিকেট খেলা কতটা সম্ভব
মানুষের শরীরে সাধারণত দুটি কিডনি থাকে। তবে জন্মগতভাবে একটি কিডনি নিয়েও অনেকে সুস্থ জীবনযাপন করেন। ক্রিকেট খেলার ক্ষেত্রেও একটি কিডনি থাকা সরাসরি নিষেধাজ্ঞার কারণ নয়।
বিসিবির প্রধান চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ চৌধুরীর মতে, একটি কিডনি থাকলে ক্রিকেট খেলা যাবে না—এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে কিডনিতে আঘাত বা ক্ষতি হলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে এ ধরনের ক্ষেত্রে খেলাধুলা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
ফাহিমের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও ব্যতিক্রমী। কারণ, নিজের শরীরে একটি কিডনি না থাকার বিষয়টি না জেনেই তিনি দীর্ঘ সময় পেশাদার ক্রিকেট খেলেছেন এবং জাতীয় দলের হয়েও মাঠে নেমেছেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বিরল উদাহরণ
একটি কিডনি নিয়ে জন্মে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন—এমন আর কোনো ক্রিকেটারের উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে অসুস্থতা বা অন্য কারণে একটি কিডনি হারানো কিংবা কিডনি দান করা ক্রিকেটারের নজির রয়েছে।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারও ফাহিমের বিষয়টি জেনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, খেলোয়াড়ি জীবনে ফাহিমকে দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে তাঁর একটি কিডনি নেই। বরং তিনি ছিলেন ফিট ও কার্যকর একজন অফ স্পিনার।
এখন কেমন আছেন ফাহিম
ক্রিকেটজীবনে বড় কোনো সমস্যা অনুভব না করলেও বর্তমানে কিডনি নিয়ে জটিলতায় ভুগছেন ফাহিম। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তাঁর শারীরিক সমস্যা বাড়তে থাকে। ৩০ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ডায়ালাইসিস, যা বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন করতে হচ্ছে।
চিকিৎসকেরা তাঁকে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। ভারত বা পাকিস্তানে এ চিকিৎসায় প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে বিসিবি ও ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব তাঁর পাশে থাকার এবং আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্যও একটি পরামর্শ দিয়েছেন ফাহিম। তাঁর মতে, খেলোয়াড়দের জন্য পেনশনের মতো ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে ক্যারিয়ার শেষে চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে তাদের আর্থিক সংকটে পড়তে না হয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ