
উত্তর-পূর্ব ভারতের সংগীতজগতের অন্যতম উজ্জ্বল নাম জুবিন গার্গ। আসামের লোকসংস্কৃতি থেকে শুরু করে বাংলা, হিন্দি এবং আরও নানা ভাষার সংগীতে নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও সৃষ্টিশীলতার ছাপ রেখে গেছেন তিনি। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরে তার আকস্মিক প্রয়াণের পর পেরিয়ে গেছে এক বছর। সময় এগিয়ে গেলেও শ্রোতাদের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি তার গান, তার কণ্ঠ কিংবা তার সৃষ্টির স্মৃতি।
জুবিন গার্গের সংগীতযাত্রার শেকড় ছিল আসামের মাটি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৯২ সালে অসমীয়া ভাষার অ্যালবাম ‘অনামিকা’র মাধ্যমে পেশাদার সংগীতজীবনের সূচনা করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে নিজের গানের মাধ্যমে আসামের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান। লোকগান, রক, পপ—কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘরানার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং নানা ধরনের সংগীতকে নিজের মতো করে গ্রহণ করে তৈরি করেছিলেন আলাদা এক সুরভুবন।
২০০৬ সালে অনুরাগ বসুর ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমার ‘ইয়া আলী’ গানটি তাকে ভারতের মূলধারার শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে। গানটির আবেগঘন পরিবেশন তার কণ্ঠকে রাতারাতি পৌঁছে দেয় দেশের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে। তবে বলিউডে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরও নিজের আঞ্চলিক সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি তার টান কখনো কমেনি।
অসমীয়া সংগীতে জুবিন ছিলেন একাধারে গায়ক, সুরকার ও সৃষ্টিশীল শিল্পী। ‘মায়াবিনী’র মতো গান তাকে শুধু একজন জনপ্রিয় শিল্পী নয়, বরং অসমের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করে। তার কণ্ঠে স্থানীয় জীবন, মানুষের আবেগ এবং মাটির গন্ধ এমনভাবে ফুটে উঠত যে শ্রোতারা তার গানের সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পেতেন।
বাংলা গানেও জুবিন গার্গের ছিল বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা। ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’, ‘পিয়া রে’ কিংবা ‘মন মানে না’র মতো গান তার কণ্ঠে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল। বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে নিজের আত্মিক সম্পর্কের কথা তিনি বিভিন্ন সময় তুলে ধরেছেন। এমনকি নিজেকে ভালোবেসে ‘আধা বাঙালি’ বলেও পরিচয় দিতেন।
জুবিনের প্রতিভা শুধু গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সুরকার, গীতিকার, অভিনেতা ও পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। ‘মিশন চায়না’ এবং ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র মতো চলচ্চিত্রে তার বহুমুখী সৃষ্টিশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। অর্থাৎ সংগীত তার কাছে শুধু পেশা ছিল না; এটি ছিল নিজেকে প্রকাশ করার একটি বিস্তৃত মাধ্যম।
খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল গভীর। সমাজের নানা সংকট, পরিবেশ রক্ষা এবং বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো বিষয়েও তাকে সক্রিয়ভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে আসামের মানুষের দুর্দিনে তার উপস্থিতি ও সহমর্মিতা তাকে শুধু একজন শিল্পী হিসেবে নয়, সাধারণ মানুষের আপনজন হিসেবেও পরিচিত করে তুলেছিল।
তার মৃত্যুর পর সিঙ্গাপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন, তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া ভক্তদের মধ্যে তৈরি করেছিল গভীর শোক ও উদ্বেগ। কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে তার শিল্পীসত্তাই শেষ পর্যন্ত থেকে গেছে মানুষের স্মৃতিতে। গুয়াহাটির কামারকুচিতে তার শেষযাত্রায় মানুষের ঢল যেন সেই ভালোবাসারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।
জুবিন গার্গের চলে যাওয়ায় একটি কণ্ঠ থেমে গেছে, কিন্তু তার সুর থামেনি। নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও আজ তার গান শুনছে, তার সৃষ্টি নিয়ে কথা বলছে, তার কণ্ঠে নিজেদের আবেগ খুঁজে নিচ্ছে। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো এখানেই—শরীরের অনুপস্থিতির পরও তার সৃষ্টি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে থেকে যায়।
‘ইয়া আলী’র আবেগ কিংবা ‘মায়াবিনী’র মায়াময় সুর যখন আবারও কোনো শ্রোতার কানে পৌঁছে যায়, তখন জুবিন গার্গ যেন ফিরে আসেন তার গানের ভেতর দিয়ে। তাই এক বছর পরও তাকে শুধু প্রয়াত শিল্পী হিসেবে স্মরণ করা যায় না। তিনি বেঁচে আছেন তার সুরে, তার গানে এবং অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি