
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন ইউনিয়নে একাধিক নেতা প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আগেভাগেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। দল সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে কেউ যাতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন, সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির নেতৃত্বের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি নেতাকর্মীদের দলীয় শৃঙ্খলা মেনে একক প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে নেতাকর্মীদের আগে থেকেই সতর্ক করা হচ্ছে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বৈঠকগুলোতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিচ্ছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী সমর্থনের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ-সদস্যদেরও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, মাঠের বাস্তবতায় কোথাও কোথাও একাধিক নেতা মনোনয়ন চাইতে পারেন। তবে যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থিতা বৈধ হলে দল একজনকে সমর্থন করবে এবং অন্যদের সেই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ থাকলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে দলীয় সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাবে।
তৃণমূলের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে একাধিক নেতা নিজেদের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক অবস্থান তুলে ধরে দলীয় সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কোথাও সাবেক জনপ্রতিনিধিরা মাঠে নেমেছেন, আবার কোথাও নতুন মুখের তৎপরতা বেড়েছে।
ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির নেতা ও সমর্থকদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির তৎপরতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় প্রার্থীর বাইরে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের সমর্থকদের ভোট নিজেদের পক্ষে আনার কৌশল নিয়েও বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট ভাগাভাগির ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে দল সমর্থিত প্রার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলে বিভক্তি আরও বাড়তে পারে। এ কারণে নির্বাচনের তফসিল ও মনোনয়ন প্রক্রিয়া সামনে রেখে শুরু থেকেই বিদ্রোহের সম্ভাবনা ঠেকাতে চায় দলটি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের বিষয়টিও স্থানীয় নির্বাচনের সমীকরণে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
বিএনপির বরিশাল বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী হবেন একজন এবং সবাইকে সেই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে। কিছু এলাকায় একাধিক ব্যক্তি মনোনয়ন জমা দিতে পারেন, তবে যাচাই-বাছাই শেষে একজনকেই দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তৃণমূলের নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রতিযোগিতা বাড়লেও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবার শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে চাইছে না। সম্ভাব্য প্রার্থীরা এরই মধ্যে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সমর্থন জোরদারের চেষ্টা করছেন।
দলের দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের প্রস্তুতি রয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়, এটি তৃণমূলের সাংগঠনিক ঐক্য ও সক্ষমতারও পরীক্ষা। তাই প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে নির্বাচনি কর্মকাণ্ড পর্যন্ত দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে।
সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বিএনপির তৃণমূলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ ততই বাড়ছে। তবে একাধিক প্রার্থীর প্রতিযোগিতা যাতে শেষ পর্যন্ত দলীয় বিভাজনে রূপ না নেয়, সেজন্য আগেভাগেই কঠোর বার্তা দিয়ে রাখছে বিএনপির হাইকমান্ড।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি