
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রজ্ঞাপনের খসড়া রেজল্যুশন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) হয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর পর বর্তমানে তা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আইনগত যাচাই বা ভেটিং শেষ হওয়ার পর এসআরও নম্বর দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। ফলে গেজেট প্রকাশের ক্ষেত্রে এখন মূলত বাকি রয়েছে আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়াটি শেষ করা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পে-স্কেল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ২ সেপ্টেম্বর রেজল্যুশনটি বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছিল। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত আসে। এরপর প্রজ্ঞাপনটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়। বর্তমানে সেখানে প্রজ্ঞাপনের বিভিন্ন দিক যাচাই করা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশে সরকারের পক্ষ থেকে অযথা সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। প্রশাসনিক ও আইনগত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
এর আগে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে নবম জাতীয় পে-স্কেলের অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছিলেন, চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে আদেশ জারি হতে পারে। তবে ভেটিংসহ কয়েকটি আনুষ্ঠানিক ধাপ বাকি থাকায় গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাওয়ার কথা নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের। ২০তম গ্রেডের বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা মূল বেতন বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডে বেসিক বেতন বাড়ছে ১১ হাজার ৭৫০ টাকা বা প্রায় ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ।
তবে অনুমোদিত নতুন বেসিকের পুরোটা একসঙ্গে কার্যকর হবে না। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই তিন ধাপে বাড়তি বেতন মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত অংশের অর্ধেক প্রথম ধাপে, এক-চতুর্থাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ তৃতীয় ধাপে কার্যকর হবে। অন্যদিকে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে বাড়তি অংশের ৪০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ হারে তিন ধাপে নতুন বেসিক কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০তম গ্রেডে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেসিক ২০ হাজার টাকা হলে প্রথম ধাপে ৫ হাজার ৮৭৫ টাকা যোগ হয়ে বেতন দাঁড়াবে ১৪ হাজার ১২৫ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে আরও ২ হাজার ৯৩৭ টাকা ৫০ পয়সা যোগ হয়ে বেসিক হবে ১৭ হাজার ৬২ টাকা ৫০ পয়সা। তৃতীয় ধাপে একই পরিমাণ যোগ হয়ে তা শেষ পর্যন্ত ২০ হাজার টাকায় পৌঁছাবে।
প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেসিক ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৩১ হাজার ২০০ টাকা যোগ হয়ে মূল বেতন হবে ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টাকা। পরবর্তী দুই ধাপে ২৩ হাজার ৪০০ টাকা করে যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত বেসিক দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
এ ছাড়া নবম গ্রেডের বেসিকও দ্বিগুণ করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। বর্তমান ২২ হাজার টাকা থেকে এ গ্রেডের মূল বেতন বেড়ে হবে ৪৪ হাজার টাকা। তিন ধাপে বেসিক দাঁড়াবে যথাক্রমে ৩০ হাজার ৮০০, ৩৭ হাজার ৪০০ এবং ৪৪ হাজার টাকা।
নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বেসিক বেতন বাড়লেও সব ধরনের ভাতা একই সময়ে নতুন হারে কার্যকর হবে না। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন কাঠামোয় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে নতুন বেসিক পুরোপুরি কার্যকর হলেও ভাতার পূর্ণ সুবিধা পেতে সরকারি চাকরিজীবীদের আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।
নতুন বেতন কাঠামোয় নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের সম্ভাব্য মোট আয়ও বাড়বে। ঢাকায় ২০তম গ্রেডে নতুন নিয়োগ পাওয়া একজন কর্মচারীর ২০ হাজার টাকা বেসিকের সঙ্গে প্রযোজ্য ভাতা যুক্ত হলে মাসিক আয় প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা হতে পারে। তবে কর্মস্থল ও প্রযোজ্য ভাতার ধরন অনুযায়ী প্রকৃত আয় ভিন্ন হতে পারে।
১৩তম গ্রেডে নতুন নিয়োগ পাওয়া একজন সহকারী শিক্ষকের বেসিক ২৪ হাজার টাকা হলে ভাতাসহ আয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা হতে পারে। আবার ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার টাকা বেসিকের সঙ্গে প্রযোজ্য ভাতা যুক্ত হলে মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকার বেশি হতে পারে।
নবম গ্রেডে নতুন নিয়োগ পাওয়া একজন কর্মকর্তার বেসিক হবে ৪৪ হাজার টাকা। ঢাকায় ৫০ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে আরও ২২ হাজার টাকা যোগ হলে বেসিক ও বাড়িভাড়া মিলিয়ে দাঁড়াবে ৬৬ হাজার টাকা। অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতা যোগ হলে মোট আয় প্রায় ৭০ হাজার টাকা হতে পারে।
তবে পুরোনো সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন নির্ধারণ সরাসরি এসব উদাহরণের মতো হবে না। তাদের চাকরির মেয়াদ, বর্তমান মূল বেতন, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য প্রাপ্যতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বেতন, ভাতা ও পেনশন খাতে নতুন কাঠামো কার্যকর করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। এতে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগী মিলিয়ে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ সুবিধার আওতায় আসবেন।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একবারে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করা হলে সরকারের রাজস্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারত। তাই রাজস্ব আদায়, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদের মতে, কয়েক ধাপে বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। এতে একসঙ্গে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হবে না।
সব মিলিয়ে, নবম পে-স্কেলের গেজেট এখন শেষ ধাপের আনুষ্ঠানিকতায় রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হওয়ার পরই প্রজ্ঞাপন জারির পথ পরিষ্কার হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের এখন অপেক্ষা মূলত সেই চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি