| শিরোনাম: |

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বড় সংকটের মধ্যেই বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধে আরও সময় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ১ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ঋণগ্রহীতারা সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত সময় নিয়ে ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে দুই বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড রাখার সুযোগ রয়েছে। নতুন পুনর্গঠন সুবিধার জন্য আবেদনের সময়সীমাও ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে গত এক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দিয়ে আসছে। কখনো আবেদনের সময় বাড়ানো হয়েছে, কখনো ডাউন পেমেন্টের শর্ত শিথিল করা হয়েছে। সর্বশেষ বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য ১৫ বছর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ায় ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় নেওয়া নীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়িকভাবে সক্ষম কিন্তু সাময়িক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পরিশোধ না করা এবং বারবার পুনঃতফসিলের সুবিধা নেওয়া ঋণগ্রহীতাদের জন্য একই ধরনের ছাড় অব্যাহত থাকলে ঋণ পরিশোধের শৃঙ্খলা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে জুনে খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে এককালীন ‘স্পেশাল এক্সিট’ সুবিধা চালু করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এককালীন অর্থ পরিশোধ করে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তি করলে সুদ মওকুফের সুযোগ রাখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে এনে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো।
তবে একের পর এক বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ফলে প্রশ্ন উঠছে, এসব উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণ কমাচ্ছে কি না। কারণ কোনো ঋণ পুনঃতফসিল হলে সেটি সাময়িকভাবে খেলাপি ঋণের হিসাব থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়িক সক্ষমতা বা নগদ প্রবাহের উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে একই ঋণ আবার খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ নাগাদ বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি বা অনাদায়ী অবস্থায় ছিল। এই হার দেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যবসায়িক মন্দা, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং অতীতের গোপন থাকা অনাদায়ী ঋণ শনাক্ত হওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন বড় ঋণগ্রহীতারা। ১০ বছরের পরিবর্তে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় পাওয়ায় তাদের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ থাকা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এক দশকের মধ্যেও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করতে না পারে, তাহলে আরও পাঁচ বছর সময় বাড়ানো কতটা কার্যকর হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ কেবল প্রকৃতপক্ষে টিকে থাকার সক্ষমতা থাকা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া উচিত। যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কার্যকর, ভবিষ্যৎ আয়-ব্যয়ের হিসাব বাস্তবসম্মত এবং ঋণ পরিশোধের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা রয়েছে, তাদের পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাতের সংকট শুধু ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ঋণ আদায় ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যাংকের সুশাসন নিশ্চিত করা, ঋণ বিতরণে অনিয়ম বন্ধ করা এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের প্রতি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে কোনো ব্যবসাকে সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া আর বছরের পর বছর ঋণখেলাপিদের সুবিধা দিয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। প্রকৃত সংকটে থাকা ব্যবসা ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের আলাদা করে চিহ্নিত করা না গেলে পুনর্গঠন নীতি উল্টো ঋণখেলাপির সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে টেকসই করতে হলে শুধু কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের হার কমানো নয়, বরং প্রকৃত অর্থে অনাদায়ী অর্থ উদ্ধার এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি। নইলে একের পর এক সময়সীমা বাড়ানো হলেও খেলাপি ঋণের মূল সমস্যা থেকেই যাবে এবং ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাত আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।