
জাপানের তৈরি পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাপানি ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের রপ্তানি আদেশের পোশাক উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশে ১৭২টি কারখানাকে ডেডিকেটেড বা সংরক্ষিত রাখা হচ্ছে। এসব কারখানা মূলত জাপানের ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পোশাক উৎপাদন ও সরবরাহ করবে। এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পোশাক বাজার জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে জাপান বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান অপ্রচলিত রপ্তানি বাজার। বছরে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১১৩ থেকে ১১৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। তবে জাপানের বিশাল বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। প্রায় ১৩ কোটি মানুষের দেশটিতে তৈরি পোশাকের বাজার প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে জাপানের পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ১ শতাংশের কিছু বেশি।
জাপানি বাজারে রপ্তানি বাড়াতে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে চালু করা হচ্ছে ‘বিজিএমইএ-জাপান ডেস্ক’। এই ডেস্কের মাধ্যমে জাপানের বাজার নিয়ে গবেষণা, নতুন ক্রেতা খোঁজা এবং জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে জেট্রো, জাইকা, জেবিসিসিআই ও জেসিআইএডির মতো প্রতিষ্ঠান।
জাপানি ক্রেতা ও বাংলাদেশের কারখানার মধ্যে কোনো ধরনের সমস্যা বা বিরোধ তৈরি হলে তা সমাধানেও সহায়তা করবে এই ডেস্ক। একইভাবে বাংলাদেশের কারখানার সঙ্গে কাজ করার সময় জাপানি কোম্পানিগুলো কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বুধবার ঢাকার উত্তরায় বিজিএমইএ ভবনে জাপানের রাষ্ট্রদূত শিন ইচি সাইদা এই ডেস্ক উদ্বোধন করবেন।
জাপানের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এক বছর আগে ‘কৌশলগত বাজার উন্নয়ন’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দুই দেশের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের বাধাগুলো চিহ্নিত করা হয়। এর অংশ হিসেবে ২৭৭টি কারখানা নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭২টি কারখানাকে জাপানি ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের জন্য ডেডিকেটেড করা হচ্ছে।
জাপানের উল্লেখযোগ্য ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিক্লো, মুজি, জিইউ ও শিমামুরা। এসব ব্র্যান্ডের রপ্তানি আদেশ বাংলাদেশের নির্বাচিত কারখানাগুলোতে উৎপাদনের মাধ্যমে জাপানের বাজারে সরবরাহ করা হবে।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে। এর ফলে তৈরি পোশাকসহ ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। পাশাপাশি উৎসবিধির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশনের সুবিধার কারণে অন্য দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে বাংলাদেশে পোশাক তৈরি করেও নির্দিষ্ট শর্তে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশও জাপানি পণ্যের জন্য বাজার সম্প্রসারণ করছে। চুক্তির আওতায় জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্য পর্যায়ক্রমে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে জাপানের ১২০টি সেবা খাতে বাংলাদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক রপ্তানি পরিসংখ্যানে কিছুটা ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশ থেকে ১১৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ কম। জাপানে নিট পোশাকের তুলনায় ওভেন পোশাকের চাহিদা কিছুটা বেশি। গত অর্থবছরে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি ডলারের এবং ওভেন পোশাক ৫৭ কোটি ডলারের কিছু বেশি।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে অবশ্য জাপানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ২২ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পোশাক, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২২ কোটি ৪২ লাখ ডলার। নতুন জাপান ডেস্ক, ডেডিকেটেড কারখানা এবং ইপিএর শুল্কমুক্ত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি