বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু      পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান সম্ভব      যুবসমাজকে মাদকের গ্রাস থেকে রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব: সাচিং প্রু      সনদের পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন জরুরি: শ্রমমন্ত্রী      ৮ মাসে পেরিয়ে গেলেও ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া জায় নেই      বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ       একাদশের শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন      ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল আরও ৮ জনের      শরণখোলায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির বিক্ষোভ      রৌমারীতে উপজেলা কাব ক্যাম্পুরীর উদ্বোধন      কপোতাক্ষে মিলল ভ্যানচালক ইখলাসের মরদেহ      টাঙ্গাইল সেতুর প্রকৌশলীকে স্ট্যান্ড রিলিজ      
ব্যস্ত যশোরের গাছিরা: লক্ষ্য একশ’ কোটি টাকার রস, গুড় ও পাটালি ব্যবসার
কে এম রফিক, যশোর
প্রকাশ: রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৫, ৩:১০ AM
সদর উপজেলার পতেঙ্গালী গ্রামের মাঠে খেজুর গাছ কাটছেন গাছি টিপু সুলতান।

সদর উপজেলার পতেঙ্গালী গ্রামের মাঠে খেজুর গাছ কাটছেন গাছি টিপু সুলতান।

বাংলা সনের ষড়ঋতুর মধ্যে পৌষ-মাঘ মিলে শীতকাল। এখন কেবল হেমন্তের শেষ মাস অঘ্রহায়ণ শুরু। ষড়্‌ঋতু হিসেবে শীতকাল আসতে আরও একমাস বাকি। তবুও পুরো শীতের আমেজ বিরাজ করছে যশোরে। শীতের আবহ শুরু হয় কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে। আর এই শীত বয়ে আনে ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’ এর মৌসুম, যার সুখ্যাতি দেশময়।

ইতোমধ্যে যশোরের গাছিরা পুরোদমে নেমে পড়েছেন খেজুরের রস আহরণে। তারা আরও তিন সপ্তাহ আগে থেকে শুরু করেন প্রস্তুতি। সেসময় গাছের বাঁকল কেটে রস সংগ্রহের স্থান প্রস্তুত করেন। এখন গাছের প্রস্তুতকৃত স্থান সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কেটে রস সংগ্রহ করছেন। খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন : ঠিলে বা ভাঁড়-খুংগি-দড়া, গাছি দা, বালি ধরা ইত্যাদি প্রস্তুত করতে গাছিদের দিনের প্রথমার্ধে কেটে যায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই এসব উপকরণ নিয়ে তারা ছুটে চলেছেন গাছ কাটতে। পরদিন ভোর হতেই এক গাছ থেকে আরেক গাছ বেয়ে চলেছেন রস নামাতে। এরপর ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে বাড়ির নারীদেরও। তারা কড়াইতে রস জ্বালিয়ে তৈরি করছেন গুড়-পাটালি। এ কাজ করতে করতে তাদের সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। নিয়ম মেনে গুড়-পাটালি বানাতে গিয়ে দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না তারা। আবার কাঁচা রস খেতেও বেশ সুস্বাদু। রস দিয়ে বানানো হয় হরেক রকম পিঠা-পায়েস। বাইরে থাকা আত্মীয়-স্বজনরাও মুখিয়ে থাকেন সেই স্বাদ পেতে। বাইরের অনেক আত্মীয়-স্বজনরা দাওয়াত পেয়ে থাকেন।

অনেক ঐতিহ্যের জেলা যশোর। খেজুরের রস-গুড়-পাটালির জন্যও বিখ্যাত এ জেলা। দেশ পেরিয়ে বিদেশেও এর রয়েছে বেশ কদর। যুগ যুগ ধরে চলা জেলার এ খ্যাতি প্রকাশে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’। শীতের দিন মানেই যশোরের গ্রামাঞ্চলে খেজুর রস ও গুড়ের ঘ্রাণ, শীতের সকালে খেজুরের তাজা রস, রসের বিভিন্ন প্রকার পিঠা এবং পায়েস তো আছেই। প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাড়িতে চলছে খেজুরের রসের তৈরি খাদ্যের আয়োজন। ভোরের সংগ্রহ করা খেজুরের রসের স্বাদও অতুলনীয়। আবার সন্ধ্যা বেলা রস নামিয়ে তা খাওয়া হয় বিভিন্ন উপায়ে। তাই একটি আঞ্চলিক গানও প্রচলিত আছে ‘ঠিলে ধুয়ে দে বউ, গাছ কাটতি যাবো, সন্ধ্যা নস ঝেড়ে এনে জাউ নেন্ধে খাবো---।’

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, বর্তমানে জেলায় খেজুর গাছ রয়েছে ১৬ লাখ ২৫ হাজারের মতো। জেলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, খেজুর গাছ সাধারণত : ক্ষেতের আইলে, রাস্তার ধারে, নদী বা খালের পাড়ে হয়ে থাকে। আবার দুয়েক জায়গায় পতিত জমিতে খেজুরের বাগানও রয়েছে। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, যশোর অঞ্চলের মাটি সাধারণত বেলে দো-আঁশ। আর পানিতে লবণাক্ততা নেই। এর ফলে গাছের শিকড় অনেক নিচে পর্যন্ত যেতে পারে। সব মিলিয়ে জলবায়ু উপযোগী যশোরের খেজুরের রস সুগন্ধি ও সুস্বাদু হয়ে থাকে।

গাছিরা জানিয়েছেন, কাঁচা রস, ঠিলে বা ভাঁড় প্রতি (৩-৫ কেজি) ১৫০-২০০ টাকা বিক্রি হয়। ভালো মানের এক ভার গুড় বিক্রি হয় হাজার টাকায়। আর পাটালি কেজি প্রতি ৪০০-৫০০ টাকা। রস সংগ্রহ থেকে গুড়-পাটালি বানানো কাজটা বেশ কষ্টসাধ্য এবং সময় সাপেক্ষ। বাংলা সনের আশ্বিন মাসের (অক্টোবরের মাঝামাঝির পর থেকে) শুরু থেকে চৈত্র (মার্চ) মাস পর্যন্ত, প্রায় ৫ মাস, গাছি এবং গাছি পরিবারকে দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় এর পিছনে ব্যয় করতে হয়। অক্লান্ত পরিশ্রম করে মৌসুম শেষে গাছিদের আয়-রোজগার হয় বেশ ভালোই।

যশোরে সবচেয়ে বড় খেজুর গুড়ের হাট বসে সদরের রূপদিয়া, বাঘারপাড়ার খাজুরা, মণিরামপুর, কেশবপুর ও মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জে। ব্যবসায়ীরা এসব হাট থেকে খেজুরের গুড় ও পাটালি কিনে সারা দেশে সরবরাহ করেন। এখানকার কারিগরদের পাটালি তৈরিতে সুনাম থাকায় খেজুরের গুড়-পাটালির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশের অন্যান্য জেলায়, এমনকি দেশের বাইরেও। যশোরের সুস্বাদু এই গুড়-পাটালি অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি গাছিদের কাছে অর্ডার দিয়ে পাইকারি মূল্যে কিনে দেশের বাইরেও সরবরাহ করে থাকেন। ক’বছর আগে থেকে অনলাইনে ব্যাবসা শুরু করেছেন অনেকেই।

২০২২ সালে চৌগাছার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বর্তমানে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইরুফা সুলতানা জানান, তিনি খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণে খেজুর গুড়ের মেলা, গাছিদের প্রশিক্ষণ, গাছি সমাবেশ, গাছিদের সমবায় সমিতি গঠন, খেজুরগাছ রোপণ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। একই বছর জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য যশোরের খেজুর গুড়ের আবেদন করেন তিনি। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সেটি জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায়।

গত ২ নভেম্বর খেজুরগাছ প্রস্তুতের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। চৌগাছা উপজেলার হায়াতপুর গ্রামে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ইউএনও শাহিনুর আক্তার।

শনিবার বিকেল ৩টার দিকে সদর উপজেলার পতেঙ্গালী গ্রামের মাঠে খেজুর গাছ কাটছিলেন ওই গ্রামের গাছি টিপু সুলতান। তিনি বলেন, ‘আমার নিজস্ব কোনো খেজুর গাছ নেই। গ্রামের কয়েকজনের কাছ থেকে দেড়শ’ গাছ লিজ নিয়েছি। লিজ বা ভাগ বের করে দিয়েও মৌসুম শেষে দেড়শ’ গাছে লাখ দেড়েক টাকা মুনাফা থাকবে বলে আশা করছি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন টেলিফোনে বলেন, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে নিরাপদ রস-গুড় উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত ও সচেতন করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে গাছে ঝোলানো ভাঁড় বা ঠিলের মুখ খোলা না রেখে নেটিং পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ম্যাকানিক্যাল ক্লাইম্বার বা গাছের ওঠার যন্ত্র ব্যবহার করলে কষ্টদায়ক এ কাজ গাছিদের জন্য সহজ হয়। এ লক্ষ্যে একটি প্রজেক্টও ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

উপপরিচালক আরও জানান, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে যশোর জেলায় ৩ কোটি ৭১ লাখ লিটার রস ও ২ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারদর অনুযায়ী রস ও গুড়ের বাজার দর প্রায় ১০০ কোটি টাকা।’

স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ




আরও সংবাদ   বিষয়:  ব্যস্ত   যশোর   গাছিরা   ব্যবসা  






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close