
শীতের নরম রোদে পানাম নগরের সরু গলিপথে হাঁটছি। দুই পাশে সারি সারি পুরোনো অট্টালিকা। দেয়ালে কালচে দাগ, কোথাও টেরাকোটার নকশা ভাঙা, কোথাও আবার গাছের শিকড় চেপে ধরেছে ইটের গাঁথুনি। মনে হয়, সময় যেন থমকে আছে যেখানে প্রতিটি ইট সাক্ষ্য দিচ্ছে এক প্রাচীন রাজধানীর গৌরবময় দিনের।
ঢাকা থেকে মাত্র ২৬ কিলোমিটার দূরে বাংলার সেই রাজধানী-সোনারগাঁ। একসময় বারভূঁইয়ার নেতা ঈশা খাঁ এখানেই গড়ে তুলেছিলেন তার রাজ্য। বাণিজ্য, প্রশাসন, সংস্কৃতি-সব কিছুতেই সোনারগাঁ ছিল সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী। রাজধানী স্থানান্তরিত হলেও এখানকার ঐতিহ্য এখনো মিশে আছে বাতাসে। মসজিদের মিনারে, অট্টালিকার কারুকাজে, এমনকি মাটির গন্ধেও টের পাওয়া যায় ইতিহাসের সেই ছোঁয়া।
কী কী দেখবেন: সোনারগাঁ ভ্রমণে একদিনে যত ইতিহাস দেখা যায়, হয়ত বাংলাদেশে আর কোথাও ততটা সম্ভব নয়।সোনারগাঁ ভ্রমণ মানেই ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটা। এখানে দেখতে পাবেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের সমাধি, পাঁচ পীরের মাজার, ইব্রাহিম দানিশ মন্দের সমাধি ও সুলতান জালালউদ্দিন ফাতে শাহের মসজিদ-যা সুলতানি যুগের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। অল্প দূরেই গোয়ালদি মসজিদ, দমদমা শাহি কবরখানা, টাকশালবাড়ি আর ঐতিহাসিক পানাম নগরী, যেখানে সময় থেমে আছে শতাব্দীর প্রাচীন অট্টালিকায়। পাশেই রয়েছে নীলকুঠি ও পঙ্খীরাজ খাল বেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোঘল আমলের পানাম সেতু।এছাড়া আছে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, বারদী লোকনাথ আশ্রম, জ্যোতি বসুর জাদুঘর, আর আধুনিক আকর্ষণ হিসেবে বাংলার তাজমহল, রাজমনি ফিল্ম সিটি ও বাংলার পিরামিড -যা সোনারগাঁ ভ্রমণকে করে তোলে পরিপূর্ণ।
পানাম নগরী: পানাম নগরে ঢুকতেই মনে হলো, কোনো নীরব সিনেমার সেটে দাঁড়িয়ে আছি। দুই সারিতে সাজানো দোতলা অট্টালিকা -প্রতিটি ভবন যেন অতীতের গল্প বলে যায়। একসময় এই ঘরগুলোয় জমত জলসা, বাজত সানাই, নাচত নর্তকী। ঘাটে ভিড়ত সারিসারি বণিকের ডিঙ্গি নৌকা, চলত রেশম-সুতা-রত্নের কেনা-বেচা।
আজ সেখানে নিস্তব্ধতা। ভাঙা জানালা দিয়ে ঢোকে রোদ, দেয়ালে শ্যাওলা জমে আছে, কিন্তু পর্যটকদের কৌতূহল কমে না একটুও। প্রায় ৫২টি ভবন এখনো দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পক্ষীরাজ খাল, যার স্রোত গিয়ে মিশেছে মেঘনায়। খালের ওপর তিন খিলানের প্রাচীন সেতু -স্থানীয়দের কাছে পরিচিত পানাম সেতু।
এ নগরীর রূপ কাছ থেকে দেখতে টিকিট নিতে হয়। দেশি পর্যটকের জন্য ২০ টাকা, শিক্ষার্থীদের জন্য ১০, আর বিদেশিদের জন্য সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে নগরী রোববার বন্ধ, সোমবার অর্ধদিবস।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন: পানাম নগর থেকে একটু এগোলেই চোখে পড়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান-বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। সোনারগাঁ জাদুঘর নামেই বেশি পরিচিত এটি। প্রবেশ করলেই মনে হয়, পুরো বাংলার ঐতিহ্য যেন এক জায়গায় গাঁথা হয়েছে।
গ্যালারিগুলোয় সাজানো আছে নিপুণ কাঠখোদাই, পটচিত্র, মুখোশ, তামা-কাসার বাসন, নৌকার মডেল, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, বাঁশ-বেতের নিদর্শন আর পোড়ামাটির অলঙ্কার। প্রতিটি গ্যালারিই যেন একেকটি গল্প গ্রামীণ জীবনের, সৃষ্টিশীল হাতের, কিংবা মাটির ঘ্রাণের।
চত্বরের ভেতরে রয়েছে বিখ্যাত বড় সরদার বাড়ি—যা ঈশা খাঁর সময়ের মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য উদাহরণ। টেরাকোটার সূক্ষ্ম কারুকাজে সাজানো এই বাড়ি যেন সময়ের সঙ্গে লড়ে এখনো টিকে আছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় ২০১৬ সালে এর রেস্টোরেশন শেষে বাড়িটি ফিরে পেয়েছে হারানো ঐতিহ্যের জৌলুস।
ফাউন্ডেশন চত্বরে দর্শনার্থীদের জন্য আরও রয়েছে সুন্দর লেক, কারুপল্লি গ্রাম, লাইব্রেরি, ডকুমেন্টেশন সেন্টার ও ময়ূরপঙ্খি মঞ্চ। বৃহস্পতিবার ছাড়া বাকি দিনগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশ ফি ৫০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ১০০। বড় সরদার বাড়িতে ঢুকতে আলাদা টিকিট লাগে।
বাংলার তাজমহল: সোনারগাঁয়ের পেরাবো গ্রামে পৌঁছালে চোখে পড়ে এক আশ্চর্য দৃশ্য আগ্রার তাজমহলের প্রতিরূপ। মুক্তিযোদ্ধা ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব আহসানউল্লাহ মনি নির্মাণ করেছেন এই বাংলার তাজমহল। মার্বেল পাথরের গায়ে সূর্যের আলো পড়লে মনে হয়, সত্যিই যেন মমতাজ আর শাহজাহানের গল্প জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
তাজমহলের পাশে আছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রাজমনি ফিল্ম সিটি, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, হস্ত পণ্য আর খাবারের দোকান। কাছেই মিসরের পিরামিডের আদলে গড়া আরেকটি স্থাপনা, যার ভেতরে রয়েছে রাজা-বাদশাদের র্যাপ্লিকা মমি ও তরবারি। সব মিলিয়ে পুরো জায়গাটাই যেন ইতিহাস আর কল্পনার এক মিলনমেলা।
প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য ১৫০ টাকা।
দর্শনীয় স্থানগুলোয় কীভাবে যাবেন : ঢাকার গুলিস্তান হকি স্টেডিয়াম এলাকা থেকে স্বদেশ ও দোয়েল পরিবহনের বাসে সরাসরি যেতে পারেন সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা পর্যন্ত। সেখান থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় ৫–১০ মিনিটের পথ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ও পানাম নগর পর্যন্ত। পেরাবো গ্রামের বাংলার তাজমহল যেতে চাইলে মদনপুর হয়ে সিএনজিতে যেতে পারেন সহজেই।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে