
পদ্মার বিশাল চরাঞ্চল এখন আর কৃষক বা জেলেদের নিয়ন্ত্রণে নেই পুরো এলাকা এখন নিয়ন্ত্রিত এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী চক্রের হাতে। নাম তার ‘কাকন বাহিনী’। প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে গুলি, হামলা ও লুটপাট। চরবাসীর মুখে এখন একটাই নাম রোকনুজ্জামান কাকন, যিনি নিজেকে পরিচয় দেন ‘ইঞ্জিনিয়ার কাকন’ হিসেবে।
কুষ্টিয়া, পাবনার ঈশ্বরদী ও সুজানগর, নাটোরের লালপুর, রাজশাহীর বাঘা ও চারঘাট সব জায়গাতেই এখন কাকনের প্রভাব বিস্তৃত। স্থানীয়দের ভাষায়, “কাকনের অনুমতি ছাড়া পদ্মায় নামা মানে মৃত্যু ডেকে আনা।”
কাকন বাহিনীর ভয়ে চরবাসী জমিতে যেতে পারেন না, জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে সাহস পান না। গত এক বছরে ঈশ্বরদী থানায় কাকন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা হয়েছে। লালপুর ও বাঘা থানায়ও রয়েছে একাধিক মামলা। চর দখল, বালু ব্যবসা ও চাঁদাবাজিতে কাকন বাহিনীর দাপট চলছে অব্যাহতভাবে।
দিন-রাতের যেকোনো সময় নদীর বুক থেকে গুলির শব্দ শোনা যায় যা এখন চরবাসীর কাছে স্বাভাবিক এক আতঙ্ক।
কাকনের জন্ম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের মাজদিয়া গ্রামে। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার না হয়েও তিনি নামের সঙ্গে ‘ইঞ্জিনিয়ার’ শব্দটি যুক্ত করেছেন। একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও পরে জড়িয়ে পড়েন সন্ত্রাস ও আধিপত্যের রাজনীতিতে।
তার বাহিনীর মূল সহযোগী তিনজন ঈশ্বরদীর যুবলীগ নেতা মিলন চৌধুরী, কুষ্টিয়ার কালু ও মুকুল। মুকুল বর্তমানে কারাগারে থাকলেও বাকি দুজনসহ কাকন শতাধিক অস্ত্রধারী বাহিনী নিয়ে পদ্মা চরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন।
গত কয়েক মাসে কাকন বাহিনীর হাতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে।
সোমবার, রাজশাহীর বাঘায় গুলি করে হত্যা করা হয় দুইজনকে।
২৬ মে, ঈশ্বরদীর সাঁড়াঘাটে বালুমহাল দখল নিয়ে সংঘর্ষে গুলিতে আহত হন ছয়জন।
২৮ মে, কৃষকের গরু ছিনতাই ও জবাই করে ভোজ করে বাহিনীর সদস্যরা।
৫ জুন, সাঁড়াঘাটে বালুমহাল দখলকে কেন্দ্র করে গুলি চালিয়ে আশপাশের বাড়িঘরে তাণ্ডব চালানো হয়।
৬ অক্টোবর, তরিয়া মহলের ইজারাদারের নৌকা ও স্পিডবোট ছিনতাই করে দুই কৃষককে গুলি করা হয়।
চরবাসীর ভাষায় “আমরা বন্দুকের আওয়াজে ঘুমাই, গুলির শব্দে জাগি।”
বালু উত্তোলনের ইজারাকে কেন্দ্র করেই মূলত কাকন বাহিনীর উত্থান। পদ্মার দুই প্রান্তে এখন দুই পক্ষের লড়াই একপক্ষে কাকন আলী, অন্যপক্ষে ঈশ্বরদীর ইজারাদার সুলতান আলী বিশ্বাস টনি। এই দ্বন্দ্বে এ পর্যন্ত অন্তত সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
ইজারাদার মেহেদী হাসান বলেন, “কাকন বাহিনী অন্তত পাঁচবার আমাদের ঘাটে হামলা চালিয়েছে। প্রশাসনের ভয়ে নয়, প্রশাসনের নীরবতায়ই তারা বেড়ে উঠছে।”
ভুক্তভোগী কৃষক আবদুল মোত্তালিব বলেন, “চরে গেলেই গুলি চলে। গরু, ধান, নৌকা সব লুটে নেয় কাকনের লোকজন। কেউ কিছু বলতে পারে না, সবাই ভয় পায়।”
ঈশ্বরদী থানার ওসি আ. স. ম. আবদুন নূর জানান, “কাকনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো নদীকেন্দ্রিক হওয়ায় নৌ পুলিশ তদন্ত করছে। ইতোমধ্যে গোলাবারুদসহ কাকন বাহিনীর ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “তথ্য অনুযায়ী কাকন বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে। পদ্মার চরে অভিযান চালালে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে, তবে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েই শিগগির অভিযান শুরু করা হবে।”
একসময় দক্ষিণাঞ্চলে সন্ত্রাসের প্রতীক ছিল সিরাজ সিকদার বা পান্না বাহিনীর নাম। এখন সেই স্থানে উঠে এসেছে নতুন এক নাম কাকন বাহিনী। প্রশাসনের নীরবতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে পদ্মার চরে যেন আবার ফিরে এসেছে পুরোনো দানবের ছায়া।
চরবাসীর এখন একটাই প্রশ্ন “কবে ফিরবে পদ্মার চরে শান্তি?”
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে