
প্রতীকী ছবি
বহুল প্রতীক্ষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ আজ শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত হচ্ছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা।
এরই মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ১৭টি বিষয়ে ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের পূর্ণ ঐকমত্যে ৮৪ দফার এই সনদ চূড়ান্ত করেছে। বাকি ৬৭টি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া হয়েছে।
গত ১৪ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় চূড়ান্ত সনদটি।
সনদের মূল কাঠামো
সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ৮৪ দফার মধ্যে ৪৭টি সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার, আর বাকি ৩৭টি আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারযোগ্য।
৪০ পৃষ্ঠার এই সনদে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কর্মকাণ্ড, সংস্কারযজ্ঞের পটভূমি, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও স্বাক্ষরের স্থান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংবিধান সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ দফা
বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য ভাষার স্বীকৃতি।
‘বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়’ সংযোজন।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান পরিবর্তন।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে যুক্ত হয়েছে: সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় সম্প্রীতি।
রাষ্ট্রপতির নির্বাচন প্রক্রিয়া: গোপন ভোটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের যৌথ অধিবেশনে নির্বাচন।
প্রধানমন্ত্রী পদে মেয়াদ সীমা: এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর।
প্রধানমন্ত্রীর দলীয় প্রধান না থাকা বাধ্যতামূলক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার গঠন, মেয়াদ ও ক্ষমতা নির্ধারণ।
সংসদ ও বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন, উচ্চকক্ষে নারী প্রতিনিধিত্ব ১০০ জন।
বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচন।
৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষ করার প্রস্তাব।
বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালীকরণ, এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরি নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা।
আইনসভা ও প্রশাসনিক সংস্কার
নির্বাচন কমিশন গঠনে বাছাই কমিটি পদ্ধতি।
ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান।
দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর।
জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন।
তিনটি পৃথক সরকারি কর্ম কমিশন (সাধারণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য)।
কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন।
পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাব:
পুলিশ বাহিনীর জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে।
এর চেয়ারম্যান হবেন আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, এবং সদস্য সচিব হবেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
কমিশনে মানবাধিকার কর্মীসহ অন্তত দুইজন নারী সদস্য থাকবেন।
কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে থাকবে:
পুলিশের বেআইনি কর্মকাণ্ডের তদন্ত ও শাস্তি নির্ধারণ,
নাগরিক অভিযোগের নিষ্পত্তি,
পুলিশ বাহিনীর পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ,
এবং প্রয়োজন মনে করলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত পরিচালনা।
সাত দফা অঙ্গীকারনামা:
রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ সনদ বাস্তবায়নে সাত দফা অঙ্গীকার দিয়েছে:
১. গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন।
২. সনদকে সংবিধানের তফসিল হিসেবে যুক্তকরণ।
৩. সনদের বৈধতা আদালতে প্রশ্ন না তোলা।
৪. গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি প্রদান।
৫. গুম, খুন ও নির্যাতনের বিচার এবং শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা।
৬. সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন।
৭. অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারসমূহ দ্রুত কার্যকর করা।
আজকের এই ঐতিহাসিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর সূচনা ঘটতে যাচ্ছে।