
সংগৃহীত ছবি
সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরের আটুলিয়া ইউনিয়নে কৃষক রেখা রাণীর জমিতে দেখা মেলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। এক পাশে থৈথৈ করছে লবণ পানির চিংড়ি ঘের, অন্য পাশে দুলছে সোনালি ধানের শীষ। একই জমিতে দুই গল্প, ধান ও সবজির সাফল্যের পাশাপাশি ঘেরের লবণাক্ত পানিতে মাটির উর্বরতা হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রেখা রাণী বলেন, আমার দুই বিঘা জমির একপাশে চিংড়ির ঘের, আরেকপাশে তিন বিঘা জমিতে ধান। ঘেরের দিকটা লবণাক্ত হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অন্যপাশে ধান ভালো হচ্ছে। বর্ষাকালে লবণ কিছুটা কমলে ঘেরের পাড়ে ঢেঁড়স, লাউ, বাঁধাকপি চাষ করি ভালো লাভও হয়। পেটের দায়ে ঘের করি, কিন্তু যদি কেউ দেখিয়ে দেয় কোথায় ঘের করলে ক্ষতি হবে না আর কোথায় ধান বা সবজি চাষ ভালো হয়, তাহলে সবাই পরিকল্পিতভাবে করতে পারবে।
রেখা রাণীর মতো আরও অনেকে এখন লবণসহনশীল ধান ও সবজি চাষে আগ্রহী। কৃষি অফিসের পরামর্শে তারা জৈব সার ব্যবহার করে জমির লবণমাত্রা কমাচ্ছেন। রেখা আরও বলেন, আগে ঘেরে কাজ করতাম, পরে বুঝেছি লবণ পানি জমি নষ্ট করে। কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তায় এখন নিজের জমিতে ধানও হচ্ছে, সবজিও ভালো হয়।
শ্যামনগরের বাস্তব চিত্রও উদ্বেগজনক। বুড়িগোয়ালিনী ও পদ্মপুকুর ইউনিয়নে ধীরে ধীরে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। বুড়িগোয়ালিনীতে বর্তমানে আছে ২টি নদী, ২০টি খাল, ১১টি বিল, ৫০টি মিষ্টি পানির ঘের ও ২,৮০০টি নোনা পানির ঘের। স্থানীয় কৃষক অর্ণব কুমার বলেন, “আমাদের এলাকায় ধানের জমি প্রায় নেই। গরমে স্যালো দিয়ে কিছু ধান হয়, কিন্তু লবণ পানি ঢুকলে জমি বছরজুড়ে নষ্ট থাকে। আটুলিয়ায় নদীর লবণত্ব কম, তাই ওখানে ধান টিকে আছে, আমাদের দিকে শুধু মাছ।”
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চিত্রও প্রায় একই। এখানে ২টি নদী, ২০টি খাল ও ২,০০০টির বেশি নোনা পানির ঘের রয়েছে। স্থানীয় কৃষক ঝন্টু কুমার জানান, নদী থেকে পানি তুলে ঘের করি, মাছ ঠিকই হয়, কিন্তু জমিতে ধান আর হয় না।
২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ গাবুরা ইউনিয়নের কৃষি ইতিহাস বদলে দিয়েছে। একসময় ধান, পাট, শাকসবজিতে ভরা ছিল এই অঞ্চল। এখন চারপাশের নদী থেকে লবণ পানি তুলে ঘেরেই চলে জীবিকা। ৩০ বছরের অভিজ্ঞ কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, আইলার আগে গাবুরায় ধান-পাট সবই হতো। এখন ঘের করি, বর্ষায় লবণ কমলে পাড়ে কিছু সবজি দিই, এতে কিছুটা লাভ হয়।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, আমরা কৃষকদের ঘেরের পাড়ে সবজি চাষে উৎসাহ দিচ্ছি। এতে একদিকে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটে, অন্যদিকে বাড়তি আয় হয়। লবণাক্ত মাটিতে জৈব সার ব্যবহার করলে লবণমাত্রা কমে। বর্ষাকালে ভিক্তি-১০ বা প্রত্যয়-১০ মতো লবণসহনশীল ধান চাষে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরার মোট ১,৮৮,৬২৬ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৮১ শতাংশ (১,৫৩,১১০ হেক্টর) লবণাক্ততার কারণে অকৃষি জমিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া পতিত জমি রয়েছে ৪০,১০১ হেক্টর। সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় ৩৭,১৪৬ হেক্টর জমির প্রায় ৯৯ শতাংশই লবণাক্ত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ মাটির গঠন নষ্ট করছে। আমরা লবণসহনশীল ধান ও সবজির চাষ বাড়াচ্ছি, পাশাপাশি বাঁধ উঁচু করার প্রকল্প চলছে। তবে পরিকল্পনা ছাড়া উপকূলীয় কৃষি টিকে থাকবে না।
শ্যামনগরের ১৭,৭৮০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে প্রায় ৪৮০ হেক্টর ঘেরের পাশে সবজি চাষ হয়। বর্ষায় ফলন ভালো হলেও শীতকালে লবণাক্ততা বেড়ে ফসল কমে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণসহনশীল ফসল, বর্ষার পানি সংরক্ষণ ও ঘের-ধানের ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনাই কৃষি টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি। রেখা রাণীর উদাহরণই প্রমাণ করে, যেখানে জমি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পিতভাবে করা হয়, সেখানে ঘের ও ধান উভয়ই লাভজনক হয় এবং মাটির উর্বরতাও অক্ষুণ্ণ থাকে।
স্বদেশ প্রতিদিন/শাহো