
বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার ১১৭টি পূজামণ্ডপে সরকারিভাবে প্রতিটি মণ্ডপে ৫০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেয় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। বরাদ্দকৃত মোট চালের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৫৮ টন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এই চাল ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আপ্যায়নে ব্যবহারের কথা থাকলেও, বাস্তবে চলছে বরাদ্দ চালের বিক্রি-বিক্রয়ের কারসাজি।
সরকারি দামে প্রতি কেজি চালের মূল্য ৪৯ টাকা, ফলে ৫০০ কেজি চালের বাজারমূল্য ২৪ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু পূজামণ্ডপের সেই চাল মাত্র ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকায় কিনে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট মাঠপর্যায়ে মন্দির কমিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করে কম দামে চাল কিনে নিচ্ছে।
এ চক্রের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে রয়েছেন সদর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফজলুল হক, জেলা যুবদলের এক নেতার ভাই খায়রুজ্জামান লিটন এবং আরও কয়েকজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতার স্বজন।
রাজনগর মধ্যপাড়া সার্বজনীন পূজামণ্ডপের সভাপতি জানান, “প্রথমে সানোয়ার নামে এক ব্যক্তি ৫ হাজার টাকা অনুদান দেন। পরে ফজলুল হক পরিচয় দিয়ে ১৩ হাজার টাকা দিয়ে চাল কিনে নেন।”
শ্যামনগর পূজামণ্ডপের সভাপতি গৌর কুমার সাহা জানান, “চাল বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন তুললে বলা হয়, যার কাছ থেকে টাকা নিয়েছি, তাকেই চাল দিতে হবে। পরে আমরা খায়রুজ্জামান লিটনের কাছে ১৮ হাজার টাকায় চাল বিক্রি করেছি।”
আলীনগর রাজবংশীপাড়া সার্বজনীন দূর্গোৎসব কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অজয় শীল বলেন, “চাল খারাপ হবে কিনা, এই চিন্তায় আমরা ভোগ রান্নার জন্য ভালো চাল কিনে নিয়েছি। পূজা শেষে বরাদ্দের চাল বিক্রি করে দেব।”
এমন অজুহাতে অনেক মণ্ডপেই চাল রেখে না দিয়ে পূজার আগেই তা বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। যদিও সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, চাল ভোগ বা আপ্যায়নের জন্যই বরাদ্দ, বিক্রির জন্য নয়।
চাল কেনার বিষয় স্বীকার করে খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, “আমি ছাড়াও ফজলুল হক ও জাহাঙ্গীর এই ব্যবসা করছেন। মন্দির কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় চাল বিক্রি করছে, আমরা জোর করিনি।”
অন্যদিকে, সদর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফজলুল হক দাবি করেন, “আমি চাল কেনার সাথে জড়িত না। কেউ শত্রুতা করে আমার নাম জড়িয়েছে।”
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মেজবাহ উল সাবেরিন বলেন, “প্রত্যেক মন্দিরে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। তারপরও যদি কেউ অনিয়ম করে থাকে, প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি স্বার্থেই এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।”
জানা গেছে, জেলার সাতটি উপজেলার ৫৫৫টি মন্দিরেই একইভাবে বরাদ্দকৃত চাল বিক্রি হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু রাজনৈতিক নেতা, খাদ্য বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মন্দির কমিটির একাংশের যোগসাজশে এ অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে।
এতে শুধু সরকারের খাদ্য সহায়তা বিতরণ কার্যক্রমের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধই হচ্ছে না, বরং প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেআইকে