
মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল
জামালপুরের মেলান্দহে বিএনপি ডুবাচ্ছে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। তিনি বিএনপির সহ জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক ও মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির সভাপতি। রাজনীতিতে নেই আদর্শ; আছে টাকার বাণিজ্য, পদ লেনদেন ও স্বার্থপর আঁতাত। নতুন কমিটিতে জায়গা পেয়েছে দলের বহিষ্কৃতরা, চোর, চাঁদাবাজ আর আওয়ামী পন্থীরা।
জানা যায়, বাইরে প্রতিপক্ষকে শত্রু বানালেও ভেতরে তাদের কাছেই হাত পেতে দেন। নিজেকে ‘হবু এমপি’ হিসেবে পরিচিত করালেও বাস্তবে তিনি অনেক আগেই টাকার এমপি হয়ে গেছেন। প্রমাণসহ অর্ধডজন অভিযোগের ফিরিস্তি দাখিল করা হয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিব বরাবর।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি হওয়ার পর কমিটি গঠনে চলে কোটি টাকার কারবারঃ
সাংগঠনিক সম্পাদক বানানো হয় ঢাকায় বসবাসরত নুর নবী মণ্ডলকে, যিনি বিএনপির সদস্য ছিলেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের ডোনার ছিলেন। মির্জা আজমের চেম্বারে সপ্তাহে একাধিকবার হাজিরা দিতেন এ নেতা। ব্যবসা পেতে কোটি টাকা দিয়েছেন আজম গংদের। ঢাকায় সিএন্ডএফ ব্যবসা করা এ নুর নবী একলাফে মেলান্দহ উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে বসিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল।
‘টাকা ছাড়া দলীয় রাজনীতি নয়’ এ যেন বাবুলের নীতিঃ
তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, শত কোটি টাকার মালিক নুর নবী মন্ডল গত ১৬ বছরই মির্জা আজমের ডোনারের ভূমিকা পালন করেছেন। যে কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা, কারাবাস তো দূরের কথা পুলিশের কাছে তিনি অপরিচিত। এই নুর নবী মাত্র ৩০ লাখ টাকায় পদটি খরিদ করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের কাছ থেকে। একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি আছে মনোনয়ন পেলে ওই সময়ও ডোনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এ প্রসঙ্গে নুর নবী বলেন, “ভাই আমি ১৯৯৮ সাল থেকেই ঢাকায় চাকরি করছি, এরপর সিএন্ডএফের ব্যবসা করছি। ২০০৯ সালে আমাকে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ভাই থানা কমিটির সদস্য করেছেন। ২০১৪ সালে থানা বিএনপির প্রবাসী ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক, ২০২২ সালে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য করেছেন। ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আমাকে মৌখিক প্রস্তাবে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। পদ নিতে টাকা লাগেনি।”
জানা যায়, মাহমুদপুর ইউনিয়ন বিএনপির কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়েছিলেন হাজী আব্দুস সাত্তার সভাপতি ও তৈয়বুর মাস্টার সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু ঢাকায় গিয়ে বাবুল ফলাফল পাল্টে দেন। সভাপতিতে বসান আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান আতা মাস্টারের সহোদর তৈয়বুরকে, আর সম্পাদক করেন সাত্তারের ছেলে কাপড় ব্যবসায়ী বাবলুকে।
স্থানীয়দের দাবি, এ কারচুপি করতে বাবুল নিয়েছেন ৩০ লাখ টাকা। তৈয়বুর সালিশের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন, ছোট সালিশ ৫০ হাজার আর জটিল সালিশ হলে লাখ টাকা। যা সরাসরি সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ। নতুন কমিটির ১০১ সদস্যের মধ্যে ১৭ জনই আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, আর সবাই মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বিএনপিতে ঢুকেছেন।
এদিকে স্থানীয় হাজীপুর বাজারের একটি ট্রাক থেকে ২৫ হাজার টাকা চুরি করে ১০ নং ঝাউগাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক সোহাগ রানা উজ্জ্বলের ভাই জুয়েল রানা। পরে জনৈক নজরুল এবং জহরুলের মাধ্যমে সালিশ মীমাংসা হয়ে ২৩ হাজার টাকা ফেরত দেয়। চুরির আরেক কাণ্ড করেছেন ৯ নং ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কিনু মিয়ার ভাই জাকির মিয়া। তিনি একটি মাহিন্দ্র গাড়ি চুরি করেন। এই ঘটনায় টাঙ্গাইল রেলওয়ে থানায় একটি জিডি করে মালিকপক্ষ। পরে গাড়ি উদ্ধার করে, জাকিরকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
স্থানীয় রাজনীতিতে টাকার বিনিময়ে শত্রুকে বন্ধুর আসনে বসানো এখন ওপেন সিক্রেটঃ
হাজরাবাড়ী সিরাজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল আজিজ দীর্ঘদিন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। গণআন্দোলনের সময় যিনি ভয়ে কলেজে যেতেন না, তাকেই আশ্রয় দেন বাবুল। কলেজ কমিটির সভাপতি হন বাবুল নিজে, আর অধ্যক্ষকে টিকিয়ে রাখতে নেন ৪০ লাখ টাকা।
জনতার পিঠ থেকে টাকা লুটে রাজনীতি চালানোই যেন তার চালিকা শক্তিঃ
ঢাকায় অভিজাত জীবনে থাকা বাবুল নিজের অনুগতদের মাঠে নামান চাঁদাবাজির জন্য। ঝাউগড়া বাজারে যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রেজাউল সরকার রেজা ও কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ধান-চাল ব্যবসায়ী আপেল মিয়া ও সিদ্দিক মিয়ার ব্যবসার ট্রাক আটকিয়ে ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে দরকষাকষি করে ৫০ হাজার টাকায় ছেড়ে দেয়। খবর পেয়ে স্থানীয় জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে চাঁদাবাজদের সহযোগিকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। অথচ এ কাণ্ডে বাবুল নির্বিকার।
প্রতারণাই যেন বাবুলের রাজনৈতিক মূলধনঃ
দশটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে বাবুল জনপ্রতিনিধিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রলোভন দেখান। প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ৫-৭ লাখ টাকা নেন প্রত্যেকের কাছ থেকে। কিন্তু দায়িত্ব স্থগিত হওয়ার পরও টাকা ফেরত দেননি। সোহেল মেম্বারের কাছ থেকে প্যানেল চেয়ারম্যান বানানোর নামে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয়ার প্রমাণ রয়েছে।
জামালপুর-৩ আসনে বারবার আওয়ামী লীগের মির্জা আজমের কাছে হেরে গেলেও ক্ষতি হয়নি বাবুলের-অভিযোগ আছে- প্রতিটি নির্বাচনে তিনি মির্জা আজমের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছেন এবং ভোটের দিন থেকেছেন নিষ্ক্রিয়। শেষ নির্বাচনের পর ৩ কোটি টাকায় বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট কেনা নিয়েও সমালোচনা আছে। ছাত্রনেতা বাবুল আজ আওয়ামী প্রতিদ্বন্দ্বীর ‘ভেতরের খেলোয়াড়’।
বহিষ্কৃতরা বলছেন, বাবুল ভাই চেয়েছেন তাই পদ পেয়েছি-
বহিস্কৃত ও অব্যাহতি প্রাপ্ত দুই নেতা মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটিতে এখন পদধারী নেতা। উপজেলার ফুলকোচা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মতলুব হোসেন বাবু আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন। তাকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। উপজেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটিতে তাকে ৪নং সহ সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জাতীয়তাবাদী যুবদল মেলান্দহ পৌর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক মো. দেলোয়ার হোসেনকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হয়। তাকে মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটিতে দপ্তর সম্পাদক পদ দেয়া হয়েছে।
এদিকে অব্যাহতি ও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার ছাড়া কিভাবে এসব নেতা কমিটিতে স্থান পেলেন তা নিয়ে দলের সাধারণ কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
ঝাউগড়া ইউপি সভাপতি আব্দুল আলিম সরকারের ভাই আব্দুল হালিম সরকার। মির্জা আজমের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। তিনিই এখন ইউনিয়ন বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক।
সরকারি সুবিধা পরিণত হয়েছে দলীয় দুর্নীতির খাতায়ঃ
টিআর-কাবিখার প্রতি প্রকল্পে ৫-৬ লাখ টাকা বরাদ্দ এলেও বাস্তবে জনগণের জন্য থাকে মাত্র ৬০-৭০ হাজার। বাকি টাকা লুটে নেয় বাবুলের অনুসারীরা।
দলীয় নীতি ও শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে তিনি চালাচ্ছেন একক কর্তৃত্বঃ
একসময়কার সংগ্রামী ছাত্রনেতা এখন কেবল কমিশন, ঘুষ, লুটপাট আর প্রতিপক্ষের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ার গল্পে চিহ্নিত। তার আশ্রয়ে অনুগতরা চাঁদাবাজ বাহিনীতে রূপ নিয়েছে।
মেলান্দহ বিএনপির বর্তমান চিত্র শুধু একটি উপজেলার সংকট নয়, এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। টাকা, ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বার্থের কাছে ত্যাগী কর্মীদের অবদান অবমূল্যায়িত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যদি এ প্রবণতা রুখে না দেয়া যায়, তবে দুর্নীতির ডানা ছড়িয়ে পড়বে সারাদেশে, তৃণমূল হতাশ হবে, আন্দোলনের শক্তি ভেঙে পড়বে, জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা ধসে যাবে। আর দলীয় আদর্শ হয়ে পড়বে ইতিহাসের পাতায় বন্দি এক স্মৃতিমাত্র।
অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে বিএনপির সহ জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, “আমাকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সে সম্পর্কে আমি কিছু জানিনা। যাদের নিয়ে বলা হয়েছে, তাদের কাছেই জানতে চান, তারাই বলবে। এছাড়া এলাকার সাধারণ মানুষও বলবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আমার বিরুদ্ধে কারা অভিযোগ করেছে, সেটা আমি জানি না।”
স্বদেশ প্রতিদিন/আইএমএস/ওএফ