বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোন ১৯৯৭ সাল থেকে দেশের যোগাযোগ খাতে আধিপত্য বিস্তার করছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা—বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার হুমকি, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কর্মকর্তা ও এর সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, গ্রামীণফোনের শীর্ষ তিন গুরুত্বপূর্ণ পদে ভারতীয় নাগরিকদের নিয়োগের মাধ্যমে দেশের তথ্য ও নেটওয়ার্ক সরাসরি বিদেশি পাচার করা হয়েছে।
এই খবরের প্রেক্ষাপটে উঠে আসে পেগাসাসের মতো নজরদারি সফটওয়্যারের ব্যবহার, শ্রমিকদের ওপর অমানবিক ছাঁটাই, আইন অমান্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর। গ্রামীণফোনের এই কার্যক্রম কেবল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক নিরাপত্তার জন্য গভীর হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মকর্তা আনোয়ার এম হোসাইন বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মোবাইল অপারেটরগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী দল ও জনগণের উপর নজরদারি করে। আওয়ামী লীগ এসব কাজ করার জন্য ভারতীয় নাগরিক নিয়োগ দেয় বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এসব জনবলের সহায়তায় বিগত ১৭ বছর বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের অডিও কল রেকর্ড ফাঁস করে দমিয়ে রাখার চেষ্টা চালায়। এমনকি দেশের নাগরিক ও শীর্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের সকল তথ্যও বিক্রি হতো বিদেশে।
কোম্পানির শীর্ষ তিন গুরুত্বপূর্ণ পদে ভারতীয় নাগরিক এখনো বহাল তবিয়তে।ফলে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক কি এই পদগুলোতে যোগ্য ছিলো না?
খোঁজ নিয়ে জানা যায় প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ পদ চিফ টেকনোলজি অফিসার (CTO)। এই পদে রয়েছেন ভারতীয় নাগরিক জয় প্রকাশ। মূলত তিনি দেশের নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। যে কোনো সময় ইজরায়েলি স্পাইওয়্যার প্রবেশ করিয়ে নজরদারি করার পথ সহজ করে দিতে পারে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির চিফ ইনফরমেশন অফিসার (CIO) পদে রয়েছেন ভারতীয় নাগরিক ড. নিরঞ্জন শ্রীনিবাসান। তিনি সকল নাগরিকের ডাটাবেজ নিয়ন্ত্রণ করেন।ফলে গ্রাহকের সকল তথ্য সহজেই পাচার করার বিষয়টি তার এক হাতের খেলা।
এদিকে চিফ প্রোকিউরমেন্ট (CPO) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে রয়েছেন ভাঙ্গু কাওস্টুভ। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন কোন প্রতিষ্ঠান থেকে নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম ক্রয় করা হবে। আর এসব নেটওয়ার্ক সরঞ্জামের মাধ্যমে নজরদারি প্রযুক্তি প্রবেশ করানো খুবই সহজ কাজ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন বাংলাদেশের নাগরিক এমনকি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের ডেলিভারি ডাটা, সাপ্লাই চেইন এসব একসাথে তিন ভারতীয় নাগরিকের হাতে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় ৯ কোটি মানুষের সকল তথ্য তাদের কাছে।
যে কারণে ভারতীয় তিন নাগরিক দেশের জন্য হুমকি
১. জাতীয় নিরাপত্তা- দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আমলা, সেনা, বিমান, নৌবাহিনী কেউ নিরাপদ নয়।
২. সার্বভৌমত্ব- রাষ্ট্রের সকল তথ্য ও বিদেশে পাচার হওয়ার হুমকি রয়েছে।
৩. রাজনৈতিক অস্থিরতা- রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল কিংবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
এর আগে ২০০৪ সালের ৬ মে গ্রামীণফোনের তৎকালীন চিফ টেকনোলজি অফিসারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সন্দেহ উঠলে সরকার তথ্য গোপন করতে দ্রুত সময়ে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল।
টেলিখাত বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন- দেশের সবচেয়ে বড় টেলিকম কোম্পানি গ্রামীণফোনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণব পদে ভারতীয় নাগরিক থাকায় পেগাসাসের মত নজরদারি টুলস ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাবেক সেই কর্মকর্তা দাবি করেন, গ্রামীণফোন ইতোমধ্যেই পেগাসাসের সাথে প্রজেক্ট শুরু করেছে। মূলত আওয়ামী শাসনামলে এটি চালু হয়। কারণ এ প্রজেক্টে ছিলেন সৈরাচারের ঘনিষ্ঠ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এই পেগাসাসকে কার্যকর করার সবচেয়ে সহজ পথ হলো টেলিকম নেটওয়ার্ক মাধ্যম।
স্বাভাবিকভাবে জনমনে প্রশ্ন, পেগাসাস আসলে কী?
পেগাসাস হলো ইসরায়েলি কোম্পানি এনএসও গ্রুপের তৈরি একটি অত্যাধুনিক নজরদারি সফটওয়্যার। স্মার্টফোনে একবার ঢুকতে পারলেই এটি ব্যবহারকারীর অজান্তে এনক্রিপ্টেড বার্তা (হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল, টেলিগ্রাম) পড়তে পারে, ফোনের মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা চালু করে রেকর্ড করতে পারে, জিপিএস লোকেশন ট্র্যাক করতে পারে, ছবি, ভিডিও, নথি কপি করতে পারে। এমনকি চাইলে ফাইল মুছে দিয়ে অদৃশ্য করে ফেলে।
আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় ভয়ঙ্কর কোম্পানি, প্রতিষ্ঠিত করে ফ্যাসীবাদ
স্বদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে উঠে আসে, বিগত বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক প্রভাব এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্যতার মাধ্যমে ক্ষমতার এক ভয়ঙ্কর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গ্রামীণফোন অনৈতিক সুবিধা, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন, গ্রাহকের তথ্য বিক্রি এবং আইন অগ্রাহ্য করার সুযোগ পায়।আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতাদের সাথে গ্রামীণফোনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। এই সুযোগে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলে অনিয়মের কারখানা।
চোরের মন পুলিশ পুলিশ
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে গ্রামীণফোনের আইনজীবী প্যানেলও দ্রুত পরিবর্তন হয়। আর এখন বিএনপি বড় বড় আইনজীবীদের তাদের আইন টিমে যুক্ত করেন, পাশাপাশি অন্তবর্তীকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ আইনজীবীও নিয়োগ দেন তারা।অথচ একসময় তাদের মামলার দায়িত্ব পালন করতেন আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা।
গ্রামীণফোনের আইনজীবী টিমের উপদেষ্টা ছিল আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ব্যক্তি ফজলে নূর তাপস। তার রাজত্বে কোম্পানি আধিপত্য কায়েম করে শ্রমিকদের অধিকার হনন, লুটপাট ও গ্রাহকের তথ্য পাচার করে। গ্রামীণফোন কোম্পানির বিরুদ্ধে বিটিআরসি ও শ্রমিকদের করা মামলা দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা করেন তিনি।এসময় গ্রামীণফোন কোম্পানির সিইও ও শ্রমিক নেতারা আওয়ামী লীগের বড় বড় ব্যক্তিদের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে।
সাংবাদিক মোরশেদ হাবিব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক পোস্টে বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী পলকের ক্ষমতাবলে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা দেয়া হয়নি। এমনকি গ্রামীণফোনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শ্রমিক নেতা ফজলুল হক কর্মীদের পাওনা না দিয়ে পুলিশ ও র্যাবের ভয় দেখাতেন। বর্তমান গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান আওয়ামী লীগের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত বলেও জানা যায়। বিগত আওয়ামী লীগের ৭ জানুয়ারি ডামি নির্বাচনে ভোট প্রদানের পর ফেসবুকে ছবি প্রকাশ করে উল্লাসও করেন। এমনকি সালমান এফ রহমানের সাথেও ঘনিষ্ঠ ছিল এমন তথ্যও স্বদেশ প্রতিদিনের হাতে আসে।
নিয়ম বহির্ভূত সুবিধা গ্রহণ গ্রামীণফোনের
বাংলাদেশের সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ চুক্তি থাকলেও নরওয়ের সাথে এ সংক্রান্ত কোনো চুক্তি নেই। কিন্তু টেলিনর নরওয়ে কোম্পানির হলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে তারা মালিকানা বজায় রাখে। সে ধরণের কোম্পানি হল সিঙ্গাপুরে টেলিনর এশিয়া।
টেলিনর সরাসরি প্রবেশ না করে সিঙ্গাপুরের সাথে বাংলাদেশের বিনিয়োগ চুক্তির সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।১৯৯২ সালে সিঙ্গাপুর কোম্পানি টেলিনর এশিয়া ও বাংলাদেশের গ্রামীণফোনের মধ্যে ৬ বছর চুক্তি হয়। চুক্তির শর্ত ছিল ৬ বছর পর কোম্পানির সব দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে। কিন্তু সে চুক্তি ভঙ্গ করে নরওয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি টেলিনর।
টেলিনরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অতিরিক্ত মুনাফা করার জন্য, অবৈধ ভিওআইপি (VOIP) সুযোগ নেয়া, গ্রামীণফোনের কোন যানবাহন পুলিশ প্রশাসন রিকুইজিশন করতে পারবে না এমন আইন বহিরভূত সুবিধা নিতেন তারা।
গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় যে অভিযোগ উঠে, ফাইবার যোগাযোগে সিটিসেলের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায় তারা। কম দামে, অন্যায্য চুক্তিতে রেলওয়ে থেকে বাগিয়ে নেয় ফাইবার যোগাযোগ। এর বিনিময়ে গ্রামীণফোনরে পক্ষ থেকে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের দেয়া হয় নানা সুবিধা। গ্রামীণফোন কম দামে বাগিয়ে নেয়া ফাইবারগুলো ২০ গুন দামে সাবলিজ দেয় তারা। যা রাষ্ট্রের সাথে ভয়াবহ প্রতারণা। অর্থাৎ রেলওয়েকে জিম্মি করেও ব্যবসা করে তারা।
অনিয়মকে শিল্পে পরিণত করেছে গ্রামীণফোন
নরওয়ের টেলিনর মালিকানা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য যাচাই ও স্বদেশ প্রতিদিনের দীর্ঘ তদন্তে উঠে আসে অর্থের বিনিময়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি, নেটওয়ার্ক ডাউন, গ্রাহক সেবার নিম্নমান এবং ইন্টারনেট সেবায় কারচুপির মতো গুরুতর অভিযোগ।
কোম্পানির বিরুদ্ধে ভয়াবহ কর ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়, যা দেশের অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এমনকি কর্মী ছাঁটাইয়েও ৫% মুনাফা না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য কোম্পানিটি প্রতারণার পথ অনুসরণ করে গ্রাহকদের লোভনীয় অফার দেয়ায় ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম আদালতে গ্রাহক বাদী হয়ে গ্রামীণফোন কোম্পানির সিইওসহ ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন।
বিজ্ঞাপনে গ্রাহকের আবেগ পুঁজি করে আয়...
দেশের মানুষের আবেগকে পুঁজি করে বিপুল অর্থ আয় করছে টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোন। বাবা দিবস, মা দিবস আরও অন্যান্য দিবসে বিজ্ঞাপনে আবেগঘন বার্তা, পারিবারিক সম্পর্ক ও মানবিক গল্প তুলে ধরে, গ্রাহকের মন জয় করলেও বাস্তবে সামাজিক বা মানবিক কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি এমন অভিযোগও রয়েছে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে। এমনকি বাবা ও মা দিবসেও অনেককেই চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। অথচ বাবা- মায়ের প্রতি আবেগ দেখিয়ে তখনও বিজ্ঞাপন চলছিলো।
কর্মী ছাঁটাইয়ে অমানবিকতা
গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে রয়েছে কর্মী ছাঁটাই ও শ্রমিক অধিকার লঙ্গন করার অভিযোগ। শূন্য থেকে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ার কারিগরদের একের পর এক চাকরিচ্যুত করে গ্রামীণফোন।
কর্মী ছাঁটাইয়ে অভিনব কায়দা অবলম্বন করে গ্রামীণফোন। প্রথমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারী কর্মীদের, এরপর কয়েকদিন ব্যবধানে পুরুষ কর্মীদের বদলি করিয়ে তাদের অতিষ্ঠ করতেন- যাতে বিরক্ত হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন।
স্বদেশ প্রতিদিনের তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, কর্মী ছাঁটাইয়ের সূচনা ২০১২ সালের জুলাই মাসে। গভীর রাতের এক নোটিশে ২১৮ কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিদেশি একটি দেশের প্রেসক্রিপসনে কর্মী ছাঁটাই করে গ্রামীণফোন। কোম্পানির ভিতরে ও বাহিরে গড়ে উঠে সিন্ডিকেট। জানা যায়, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী তারানা হালিম, মোস্তফা জব্বার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকসহ গ্রামীণফোনের সাবেক পদস্থ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এই সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন।
এই সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করে গ্রামীণফোন তাদের 'বেস্ট এমপ্লয়ি ও বেস্ট পারফরমার' হওয়া কর্মীদের চাকুরিচ্যুত করে। তার মধ্যে আছেন ততকালীন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের ছেলে তাহকিক ও ফজলুল করিমসহ (প্রিন্স) আরো অনেকেই।
এক গণমাধ্যমের স্বাক্ষাৎকারে তাহকিক বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় দেশ-বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা হলে আমার পেশাগত জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে গ্রামীণফোন কোম্পানির একটি সিন্ডিকেট। সাড়ে ৮ বছরের চাকরি জীবন কোনো নোটিশ ছাড়াই এবং কোনো অভিযোগ না থাকা সত্বেও মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে আগে থেকে তৈরি করা অব্যাহতি কাগজে সই নিয়ে বের করে দেওয়া হয়।
তাহকিককে চাকরিচ্যুত করতে না চাওয়ার অপরাধে গ্রামীণফোনের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স স্টেকহোল্ডার রিলেশনস ডিপার্টমেন্টের প্রধান ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরীকেও ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি একইভাবে অব্যাহতি দেয় অতিউৎসাহী সিন্ডিকেট।
ক্ষোভ প্রকাশ করে গ্রামীণফোনের সাবেক সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার আহসান মোবাশ্বের বলেন, কখনোই কল্পনা করিনি মাথার উপর বাজ ভেঙ্গে পড়বে। করোনা মহামারিতে মৃত্যুর আতঙ্কে সারা বিশ্ব যখন স্থবির ছিলো। তখন বাংলাদেশের সরকার নির্দেশনা ছিল কোনো প্রতিষ্ঠান যেন শ্রমিক ছাঁটায় না করে। কিন্তু গ্রামীণফোন বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা ও শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১৫৯ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করেন। আয়নাঘর, ভলেন্টিয়ার রিটায়ার্ড, এমআরএস নাম দিয়ে জোরপূর্বক আমাদের ছাঁটায় করা হয়। আমাদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছে গ্রামীণফোন কোম্পানি। সন্তানদের লেখা পড়া চলতো আমার এই বেতনে, তাও বন্ধের পথে।
গ্রামীণফোনের সাবেক এসআর নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল হাই জানান, ততকালীন সিইও মাইকেল ফলিক গ্রামীণফোনের সকল কর্মচারীদের মধ্যে একটা মিথ্যা ইমেইল পাঠায়, সেখানে উল্লেখ ছিলো গ্রামীণফোন আর বিআরএস দিবে না, এটাই শেষ বিআরএস। এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে কর্মীকে, এর ফলে অনেকেই চাকুরি ছেড়ে দেয় এই মিথ্যা তথ্যের উপর ভিত্তি করে। এভাবেই আমাদের চাকুরি থেকে বের করে দেয় গ্রামীণফোন।
২০১৮ সালে যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০১৬-২০১৭ সালে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে এবং বলপ্রয়োগ করে ৬২৫ জন কর্মীকে বাধ্যতামূলক অবসর (বিআরএস) নিতে বাধ্য করে গ্রামীণফোন।
অভিযোগ আছে, মহামারি করোনাকালেও কর্মী ছাঁটাইয়ের ধারা অব্যাহত ছিলো। ২০২১ সালের ২০ জুন বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আরও ১৫৯ জন কর্মীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব নিয়ম-কানুন তৈরি করে এবং 'টার্গেটকৃত কর্মীদের বিশেষ কক্ষে (যা কর্মীরা "আয়না ঘর" বলে আখ্যা দেন) ডেকে তাৎক্ষণিক পরীক্ষা নিয়ে অমানবিকভাবে চাকুরিচ্যুত করা হয়।
গ্রামীণফোন কোম্পানির সাবেক কর্মী আদিবা জেরিন চৌধুরী বলেন, গ্রামীণফোন সুস্পষ্টভাবে লংঘন করছে শ্রম আইন। তারা জেনেশুনেই এই কাজ করেছে। গ্রামীণফোন জানে এদেশে কোন সিস্টেমই কাজ করে না। এত বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কর্মীরা কখনোই যাবে না। এবং গেলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা কিংবা পুলিশই ভয় দিয়ে দমন করা হবে। আমাকে জোরপূর্বক চাকুরিচ্যুত করা হয়। ১৪ বছর হয়ে গেলও আমি সুষ্ঠু বিচার পায়নি। আদৌ পাব কি না জানি না। আমাকে মানসিকভাবে কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। মানসম্মান এমনকি পরিবারের অবস্থানকে ধ্বংস করে দিয়েছে গ্রামীণফোন। ফ্যাসিস্ট কায়েম করা প্রতিষ্ঠান একজন স্থায়ীকর্মীকে তার অবস্থান ধরে রাখার জন্য গ্রামীণফোন কোম্পানি নিজস্ব নিয়ম তৈরী করে পরীক্ষা নিয়ে চাকুরিচ্যুত করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে প্রতিষ্ঠানটিতে ২০১৩ সালে স্থায়ী কর্মী ছিল ৩৬০০ জন। ২০২৩ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২৭৭ জনে।
শ্রমিকের ৫% ন্যায্য মুনাফা থেকে বঞ্চিত, শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি
শ্রম আইন অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন থাকার কথা কিন্তু তা না করে গ্রামীণফোন ট্রেড ইউনিয়নের রেজিষ্ট্রেশন আটকে দেয় ২০১২ সালে। বিভিন্ন টালবাহনার পর ২০১৯ সালে তা অনুমতি পায়।
২০০৬ বাংলাদেশের শ্রম আইনানুসারে গ্রামীণফোন শ্রমিকদের মুনাফা বন্টন তহবিল (ডব্লিউপিপুএফ) মুনাফার ৫% চাকুরিদের প্রদান করতে বাধ্য। কিন্তু তারা শ্রম আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তা প্রদান করেনি। 'টেলিকম কোম্পানি শিল্প প্রতিষ্ঠান নয় এমন অভিযোগ করে গ্রামীণফোন।
২০১০ সালের ৫ অক্টোবর শ্রম মন্ত্রণালয় SRO (No. 336-Ain/2010) এর মাধ্যমে মোবাইল টেলিকম কোম্পানিগুলোকে "Industrial Undertaking" হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে গ্রামীণফোন লিমিটেডে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা আইন অনুযায়ী ৫% মুনাফার অংশীদার হয়। কিন্তু এই ৫% এর টাকা দিতেও বিলম্ব করে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। এরপর শ্রমিকরা আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালত ২০১৪ সালে নির্দেশে গ্রামীণফোন শ্রমিকদের ২০১০-১২ সালের মূল টাকা পরিশোধ করে। কিন্তু সুদের টাকা এমনকি ৫% বিলম্ব জরিমানা প্রদান করেনি গ্রামীণফোন। এই বিষয়ে প্রাক্তন কর্মীরা প্রতিষ্ঠানটির হেড অফিসের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিলে ২৯ জনের নামে মামলা দায়ের করা হয়। সাবেক কর্মীরা জানায় তাদের নামে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হয় যাতে কেউ মুখ না খুলতে পারে।
এমনকি চেক হস্তান্তরের সময় শ্রমিকদের একটি শর্তযুক্ত আন্ডারটেকিং সই করানো হয়, কিন্তু শ্রমিকদের তা পড়ার সুযোগ দেয়া হয়নি। এদিকে এই ৫% টাকার উপর ইন্টারেস্ট থেকে কর্মীরা এখনো বঞ্চিত রেখেছে।
গ্রামীনফোনের সাবেক স্পেশালিষ্ট (এসটিএম) এবং চাকরিচ্যুত ও অধিকার বঞ্চিত গ্রামীণফোন শ্রমিক ঐক্য পরিষদ আহবায়ক আবু সাদাদ মোহাম্মদ সোয়েব বলেন, ৫% মুনাফা তারা জমিয়ে পুনরায় বিনিয়োগ করে হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। নিয়মানুযায়ী সেই মুনাফার ৭৫% কর্মচারীদের দিয়ে দিতে হবে কিন্তু তারা তা নিয়ে গড়িমসি করছে। তাছাড়া নরওয়ে বা ইউরোপীয় সিইও থাকাকালীন সময়ে গ্রামীনফোনে কোন অনিয়ম হয়নি। কোন ধরনের কর্মচারী কর্মকর্তা ছাঁটাই হয়নি। যখনই বাংলাদেশে ভারতের সিইও নিয়োগ দেওয়া হলো। তখন থেকেই গণ ছাঁটাই শুরু হলো।"
শ্রম আইনে ২৬১ ধারায় বলা আছে, ভবিষ্য তহবিলে জমাকৃত অর্থ বিনিয়োগ হইতে অর্জিত লভ্যাংশ বা মুনাফা বৎসরের শেষে প্রত্যেক সদস্যের হিসাবে আনুপাতিক হারে জমা করিতে হইবে। কিন্তু গ্রামীণ ফোন এখানে শ্রমীকদের ন্যায্য পাওনা থেকেও বঞ্চিত করে রেখেছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এর ধারা ২৩৩ (১) (চ) অনুযায়ী দেশের সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে Workers Profit Participation Fund (WPPF) এবং Workers Welfare Fund (WWF) গঠন ও শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা প্রদান বাধ্যতামূলক করে।
তবে, গ্রামীণফোন লিমিটেড উক্ত গেজেটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশন নং ৩৪৬৬/২০১১ দায়ের করে। আদালত শুধুমাত্র গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে গেজেটের কার্যকারিতা স্থগিত রাখেন।
গ্রামীণফোনের কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে জমা হলেও এখন তা জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বার্থ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিদেশি নাগরিকদের হাতে নেটওয়ার্ক ও গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের প্রতি অমানবিক আচরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন আর শুধু একটি টেলিকম কোম্পানি নয়, বরং এক অঘোষিত ক্ষমতার কেন্দ্র।
টেলিখাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবিলম্বে কার্যকর নজরদারি, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং আইন প্রয়োগ ছাড়া গ্রামীণফোনের কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। দেশের জনগণের তথ্য, অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে একাধিকবার মুঠোফোন ও ইমেইলে যোগাযোগ করেও গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমানের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।