
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গত ৯ মে, ২০২৫ তারিখে জারিকৃত “ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫” দেশের আর্থিক খাতে এক যুগান্তকারী সংস্কারের সূচনা করেছে। খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, কতিপয় ব্যাংকের চরম দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক সুশাসনের ঘাটতির মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে এই অধ্যাদেশকে একটি অপরিহার্য ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মূল লক্ষ্য হলো, কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালে বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও কার্যকর পন্থায় তাকে উদ্ধার করা অথবা তার অবসান ঘটানো। এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য- দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাকে বড় ধরনের সংকট থেকে রক্ষা করা এবং সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সুরক্ষা প্রদান করা। তবে, অধ্যাদেশের কিছু আধুনিক বিধান, বিশেষত ‘বেল-ইন’ (Bail-in) বা অভ্যন্তরীণ দায়গ্রহণের মতো ধারণা ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন এই অধ্যাদেশ অপরিহার্য ছিল?বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নানাবিধ অনিয়ম, লাগামহীন দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে এক সংকটজনক অবস্থায় উপনীত হয়েছিল। এস. আলম গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ এবং পরবর্তীতে তা খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার ঘটনা ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের চরম অবনতিকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল, বহু ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে ভুগছিল এবং গ্রাহকদের আস্থার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল।
এই ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার ফলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় একটি ‘সিস্টেমিক রিস্ক’ বা পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পথে ছিল। অর্থাৎ, কোনো একটি বড় ব্যাংক ব্যর্থ হলে তার প্রভাব সমগ্র আর্থিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। অতীতে এই ধরনের সংকট মোকাবিলায় মূলত ‘বেল-আউট’ (Bail-out) বা সরকারি কোষাগার থেকে জনগণের করের অর্থ দিয়ে ব্যাংক উদ্ধারের প্রথা প্রচলিত ছিল। কিন্তু এই পদ্ধতির দুটি বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। প্রথমত, এটি ব্যাংকের মালিক ও পরিচালকদের মধ্যে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয় বা ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি করত। তারা জানতেন, ভুল বা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে ব্যাংক ব্যর্থ হলেও সরকার জনগণের টাকায় তা উদ্ধার করবে। ফলে তারা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করতে উৎসাহিত হতেন। দ্বিতীয়ত, এর সমস্ত আর্থিক দায়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ওপরই চাপানো হতো, যা ছিল চরম অনৈতিক ও অবিচারমূলক।
বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এই সংকট উত্তরণে একটি কঠোর সংস্কারমুখী অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে যেমন পূর্ববর্তী অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে, তেমনই এই নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।
অধ্যাদেশের মূল ভিত্তি ও দর্শন৯৮টি ধারা সংবলিত এই অধ্যাদেশটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকট ব্যবস্থাপনার দর্শনকেই আমূল পরিবর্তন করেছে। এটি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর বিশ্বজুড়ে ফাইনান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ড (FSB) কর্তৃক প্রণীত "Key Attributes of Effective Resolution Regimes" বা কার্যকর সংকট ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আদলে তৈরি। এর ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
অধ্যাদেশের
ধারা ৪ এটিকে একটি বিশেষ আইনি ক্ষমতা প্রদান করেছে। এই বিধান অনুযায়ী, ব্যাংক রেজল্যুশন সংক্রান্ত বিষয়ে অন্য কোনো আইন, যেমন- ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ বা কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর কোনো বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হলে এই অধ্যাদেশের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এর ফলে সংকটকালে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, ধারা ৯ এই আইনের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট করেছেঃ (১) সামষ্টিক আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, (২) সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, এবং (৩) জনগণের করের অর্থের ব্যবহার সর্বনিম্ন রাখা। তৃতীয় উদ্দেশ্যটিই ‘বেল-আউট’ প্রথা থেকে সরে আসার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
সরাসরি হস্তক্ষেপঃ
প্রশাসক নিয়োগ ও তার ক্ষমতা সংকট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই অধ্যাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা। ধারা ২০ অনুযায়ী, যখন কোনো ব্যাংক অকার্যকর (Non-viable) হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে এবং প্রচলিত তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে তার অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, তখন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদকে স্থগিত করে একজন প্রশাসক নিয়োগ করতে পারবে। প্রশাসক নিয়োগের পর ব্যাংকের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তার হাতে চলে যায় এবং তিনি পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সকল আইনগত ক্ষমতা লাভ করেন।
ধারা ২১ অনুযায়ী, প্রশাসকের ভূমিকা দুই ধরনের হতে পারেঃ১. পুনরুদ্ধার মিশন (Rescue Mission): যেখানে প্রশাসকের মূল লক্ষ্য থাকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ব্যাংকটিকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচানো।
২. বাস্তবায়ন মিশন (Implementation Mission): যেখানে প্রশাসকের প্রধান কাজ হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত রেজল্যুশন পরিকল্পনা- হোক তা ব্যাংকটি বিক্রি করা বা একটি ব্রিজ ব্যাংকে রূপান্তর করা- নির্ভুলভাবে বাস্তবায়ন করা।
ধারা ২৩ ও ২৪ প্রশাসককে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করেছে। তিনি বিশেষ নিরীক্ষা বা ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র উদ্ঘাটন করতে পারেন, সম্পদ ও দায়ের নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করতে পারেন এবং ব্যাংকের স্বার্থে ক্ষতিকর চুক্তি বাতিল, দায়ী কর্মকর্তাদের বরখাস্ত বা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রশাসকের শরীয়াহ-ভিত্তিক ব্যাংকিং বিষয়ে দক্ষতা থাকা বা এ ধরনের বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ক্ষমতা থাকবে। এই নিয়োগের বিষয়টি অবশ্যই দুটি জাতীয় দৈনিকে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ‘টুলকিট’
এই অধ্যাদেশ বাংলাদেশ ব্যাংককে সংকটগ্রস্ত ব্যাংক ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের কিছু আধুনিক কৌশল বা ‘টুলস’ প্রদান করেছে, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োগ করা যাবে।
১. সম্পদ ও দায় হস্তান্তর (Purchase and Assumption - P&A): এই পদ্ধতির মাধ্যমে সংকটে থাকা কোনো ব্যাংকের ভালো সম্পদ (যেমন, আদায়যোগ্য ঋণ) এবং দায় (যেমন, সাধারণ আমানত) দ্রুততার সাথে অন্য একটি সুস্থ ও সবল ব্যাংকের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, আমানতকারীরা কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই পরের দিন থেকে নতুন ব্যাংকের গ্রাহক হিসেবে তাদের লেনদেন চালিয়ে যেতে পারবেন। এতে বাজারে আতঙ্ক ছড়ায় না এবং আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা বজায় থাকে।
২. ব্রিজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা (Bridge Bank): যখন কোনো সংকটাপন্ন ব্যাংকের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্রেতা পাওয়া যায় না, কিন্তু ব্যাংকটির কার্যক্রম চালু রাখা জরুরি, তখন একটি ‘ব্রিজ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি একটি অস্থায়ী ব্যাংক, যা বাংলাদেশ ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ব্যর্থ ব্যাংকটির ভালো সম্পদ ও আমানতগুলো এই ব্রিজ ব্যাংকে স্থানান্তর করে এর কার্যক্রম চালু রাখা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকটির ভালো সম্পদগুলো রক্ষা করা এবং একটি স্থিতিশীল পরিবেশে উপযুক্ত ক্রেতার কাছে বিক্রির জন্য সময় নেওয়া। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ব্রিজ ব্যাংক সাধারণত দুই বছরের জন্য প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যা প্রয়োজনে বাড়ানো সম্ভব।
৩. অভ্যন্তরীণ দায়গ্রহণ (Bail-in): এটি অধ্যাদেশের সবচেয়ে আলোচিত এবং আধুনিক বিধান। ‘বেল-আউটে’র ঠিক বিপরীত এই ধারণার মূল ভিত্তি হলো- “যারা ঝুঁকি নিয়ে লাভের অংশীদার, লোকসানের দায়ভারও তাদেরই নিতে হবে।” এই পদ্ধতিতে, কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে তার ক্ষতির দায় প্রথমে ব্যাংকের মালিক বা শেয়ারহোল্ডারদের ওপর বর্তাবে। তাদের বিনিয়োগের মূল্য শূন্য হয়ে যেতে পারে। এরপর ক্ষতির দায় বর্তাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণদাতা বা বন্ডহোল্ডারদের ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ ও বিমাকৃত আমানতকারীদের অর্থ সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। তাদের অর্থ ক্ষতির সম্মুখীন হবে না। এই বিধানটি ব্যাংকের মালিক ও পরিচালকদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে বাধ্য করবে, কারণ তারা জানবে যে ব্যর্থতার প্রথম শিকার তারাই হবেন।
৪. সরকারি অর্থায়ন বা বেল-আউট (Bail-out): অধ্যাদেশে এই পথটি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়নি, তবে এটিকে শেষ আশ্রয় হিসেবে রাখা হয়েছে।
ধারা ৩৫ ও ৩৬ অনুযায়ী, শুধুমাত্র যদি কোনো বৃহৎ ব্যাংকের পতন সমগ্র আর্থিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় এবং অন্য কোনো কৌশলই কার্যকর না হয়, তবেই কঠোর শর্তসাপেক্ষে সরকার জনগণের করের অর্থ ব্যবহার করতে পারবে।
সমন্বিত সংকট ব্যবস্থাপনা
ধারা ৪২ ও ৪৩ এ একটি উচ্চ পর্যায়ের “ব্যাংকিং সেক্টর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল” গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (BSEC) মতো প্রতিষ্ঠানের সচিব বা চেয়ারম্যানরা এর সদস্য হবেন। এই কাউন্সিল নিশ্চিত করবে যে সংকটকালে সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থা মিলে একটি সমন্বিত, দ্রুত ও কার্যকর কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যা জনমনে আস্থা ধরে রাখতে এবং বাজারের অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করবে।
চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও পাওনা পরিশোধের ক্রম
ব্রিজ ব্যাংক কিংবা কোনো ব্যাংককে অবসায়ন বা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিতে গেলে পাওনাদারদের অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সেই ন্যায্যতার নীতিটি ধারা ৬৭-তে “দাবির পর্যায়ক্রম” (Hierarchy of Claims) সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ক্রম অনুযায়ী, ব্রিজ ব্যাংক কিংবা অবসায়ন প্রক্রিয়ার খরচ মেটানো হবে। এরপর সুরক্ষিত আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধ করা হবে। তারপর ধাপে ধাপে সরকারের প্রাপ্য কর, কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করা হবে। সবশেষে ব্যাংকের মালিক বা শেয়ারহোল্ডাররা। বাস্তবে, অবসায়নের ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
দায়বদ্ধতা ও কঠোর শাস্তির বিধানএই অধ্যাদেশের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান। ধারা ৭৭-এ ‘দায়ী ব্যক্তি’র সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। এর আওতায় কেবল ব্যাংকের পরিচালক বা শীর্ষ কর্মকর্তাই নন, বরং নেপথ্যে থাকা নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডার, তাদের পরিবারের সদস্য এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেও আনা হয়েছে। এর ফলে বেনামে বা পর্দার আড়াল থেকে যারা ব্যাংককে ব্যবহার করে অনিয়ম করেন, তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে।
এছাড়াও, রেজল্যুশন প্রক্রিয়া চলাকালীন ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করা, সম্পদ পাচার করা বা ডিজিটাল নথি মুছে ফেলার মতো কাজকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ধারা ৮৭ অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, “ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫” নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি কঠোর কিন্তু জরুরি সংস্কার। এটি একদিকে যেমন সংকট ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানের ক্ষমতা ও কৌশল প্রদান করেছে, তেমনই ব্যাংকের মালিক ও পরিচালকদের ওপর দায়বদ্ধতা চাপিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছে। বেল-ইন-এর মতো নতুন ধারণা জনগণের করের টাকার অপচয় রোধ করা উপায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থকে সুরক্ষিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই আইনের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে যদি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায় এবং খেলাপি ঋণ সংস্কৃতির অবসান ঘটানো যায়, তবে এটি কেবল আর্থিক স্থিতিশীলতাই আনবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি সুস্থ ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করবে। এই অধ্যাদেশ তাই নিছক একটি আইন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি নতুন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
লেখকঃ ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক।