
বাংলাদেশের সবচেয়ে অমূল্য রত্ন দরিয়া-ই-নূর, যাকে ‘কোহিনূরের সহোদর’ বলা হয়, ১১৭ বছর ধরে ব্যাংকের ভল্টে বন্দি। ১৯০৮ সালে ঢাকার নবাব পরিবার এটি বন্ধক রাখার পর থেকেই এটি ব্যাংকের হেফাজতে আছে। এত বছর ধরে কেউ এটিকে সরাসরি দেখেনি বলেই নানা রহস্য আর জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে—আসলে হীরাটি আছে কি নেই। অবশেষে সরকার ভল্ট খোলার উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে।
দরিয়া-ই-নূরের উৎপত্তি ভারতের গোলকুন্ডার হীরার খনি থেকে। কোহিনূরের মতোই এটি একসময় মোগল ও শিখ সাম্রাজ্যের রাজন্যবর্গের অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। লাহোর থেকে পাঞ্জাবের শেষ রাজা দিলীপ সিংয়ের মাধ্যমে হীরা দুটো ব্রিটিশদের কাছে যায়। তবে কোহিনূরের মতো লন্ডনে থেকে না গিয়ে দরিয়া-ই-নূরকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়।
১৮৫২ সালের এক নিলামে ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা আলিমুল্লাহ ৭৫ হাজার টাকায় হীরাটি কিনে নেন। এরপর থেকে এটি নবাবদের অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়—কখনো বাজুবন্ধে, কখনো পাগড়ির গহনা হিসেবে। তবে ঋণগ্রস্ত হয়ে নবাব সলিমুল্লাহ এটি ব্যাংকে বন্ধক রাখলে হীরার মালিকানা নবাব এস্টেট থেকে সরে যায়।
দরিয়া-ই-নূর নিয়ে রহস্যের বড় কারণ হলো একই নামে আরও কয়েকটি হীরার প্রচলন। ইতিহাসে পাওয়া যায় অন্তত চারটি ভিন্ন হীরাকে ‘দরিয়া-ই-নূর’ নামে ডাকা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ১৮২ ক্যারেটের গোলাপি হীরা, যা বর্তমানে ইরানে সংরক্ষিত। অন্যদিকে ঢাকার নবাবদের হীরাটি ২৬ ক্যারেটের টেবিল আকৃতির।
১৮৪১ সালে আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায়, পাঞ্জাবের শের সিংয়ের হাতে বাজুবন্ধ হিসেবে কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নূর দুটি একসঙ্গে জ্বলজ্বল করছে। পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লাহোর দরবারের তোশাখানা দখল করে উভয় হীরার তালিকা করে। সেখানেই প্রথমবার ঢাকার দরিয়া-ই-নূরের সুনির্দিষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়।
১৮৫১ সালের লন্ডনের গ্রেট এক্সিবিশনে দরিয়া-ই-নূর কোহিনূরের সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। দর্শকরা হীরার কাটিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও এর আকার ও ঐতিহাসিক মূল্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রদর্শনীর পর এটি ফের ভারতে পাঠানো হয় এবং কিছুদিন পরেই নিলামে বিক্রি হয়ে ঢাকার নবাব পরিবারের সংগ্রহে আসে।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ও ভারতীয় শাসকরা এই হীরাটিকে বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা করেন। ১৮৮৭ সালে কলকাতার নবাববাড়িতে ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন নিজ চোখে এটি দেখেছিলেন। তবে ব্রিটিশদের কাছে চ্যাপ্টা আকৃতির হীরার সৌন্দর্য তেমন আকর্ষণীয় মনে হয়নি।
স্কটল্যান্ডের একটি মিউজিয়ামে বর্তমানে দরিয়া-ই-নূরের মতো দেখতে একটি বাজুবন্ধ সংরক্ষিত আছে। সেখানে হীরার জায়গায় ক্রিস্টাল বসানো হলেও নকশা ও গঠন ঢাকার দরিয়া-ই-নূরের সঙ্গে প্রায় অভিন্ন। ধারণা করা হয়, এটি কোনো রেপ্লিকা হতে পারে, অথবা সিং পরিবারের কাছে একই রকমের একাধিক বাজুবন্ধ ছিল।
১৯১১ সালে ঋণ শোধ করতে গিয়ে নবাব সলিমুল্লাহ আবারও হীরাটি বিক্রির চেষ্টা করেন। তখন এটি ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং রাজা জর্জ ও রানি মেরির কাছেও উপস্থাপন করা হয়। পরে হীরাটি ফেরত আসে এবং ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির তত্ত্বাবধানে থাকে। এরপর থেকে সোনালী ব্যাংকের ভল্টেই এর অবস্থান।
আজও দরিয়া-ই-নূরকে সাধারণ মানুষ সামনে থেকে দেখতে পায়নি। জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এটি প্রদর্শনের চেষ্টা করলেও নিরাপত্তা কারণে অনুমতি মেলেনি। এ কারণে হীরাটি এখনো রহস্যে ঘেরা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখনও সোনালী ব্যাংকের ভল্টে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত আছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ