
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর
দেশের চতুর্দেশীয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে আমদানি তুলনায় বেড়েছে রপ্তানি। দীর্ঘদিন পাথর আসা বন্ধ থাকার পর ভারত থেকে আসতে শুরু করেছে পাথর। বর্তমানে ভুটান ও ভারত থেকে পাথর আমদানি হওয়ায় বন্দরটিতে ফিরতে শুরু করেছে কর্মচাঞ্চল্য। অপরদিকে আমদানির তুলনায় বন্দরটি দিয়ে নেপালে নিয়মিত যাচ্ছে পাট ও আলু। পাশাপাশি, গার্মেন্টস পণ্য, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি হচ্ছে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ঘুরে জানা যায়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশের বৈরী সম্পর্কের কারণে বন্দরটিতে দেখা দিয়েছিল বেশ স্থবিরতা। বন্দরটিতে ৯৫ শতাংশ পাথর নির্ভর হওয়ায় বিভিন্ন কারণে ভারত ও ভুটান থেকে বন্ধ ছিল পাথর আমদানি। সেই স্থবিরতা কাটছে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। ভুটানের পাথর আসলেও চারমাস পর গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ভারত থেকে আসছে পাথর। বর্তমানে ভারত-ভুটানের পাথর আসায় বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। ফলে আগের চেয়ে কর্মচাঞ্চল্যে ফিরেছে দেশের এই চতুর্দেশীয় স্থলবন্দরটি।
এদিকে, আমদানি নির্ভরতা কম হলেও বন্দরটি দিয়ে নেপালে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে কৃষিপণ্য হিসেবে আলু ও পাট। পাশাপাশি গার্মেন্ট ও প্লাস্টিক পণ্য সামগ্রীসহ খাদ্যপণ্যের বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে সরকারের রাজস্ব আদায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাবান্ধা শুল্ক স্টেশনে ৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ পর্যন্ত আদায় হয়েছে ১৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। বন্দর সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধিসহ চার দেশীয় বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা গেলে বাংলাবান্ধা দেশের প্রধান স্থলবন্দরে পরিণত হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুরু হয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের। তারপরে ভারত ও ভুটানের সঙ্গে শুরু হয় ব্যবসা বাণিজ্য। এরপর বন্দর দিয়ে সীমিত পরিসরে ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে পাথর, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা আমদানি হতো। কিন্তু সম্প্রতি বদলে গেছে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের সেই পরিস্থিতি। বর্তমানে বন্দরটি দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপুল পরিমাণে গার্মেন্টস পণ্য, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আলু এবং পাট রপ্তানি হচ্ছে নেপালে। বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেসরকারি পোর্ট অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া বন্দরটিতে ভূরাজনীতিসহ নানা কারণে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে চতুর্দেশীয় স্থলবন্দরটি।
স্থলবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যালয় জানায়, দেশের অপার সম্ভাবনাময় স্থলবন্দরটি দিয়ে এখন রপ্তানি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য। প্রতিদিন নেপালে আলু ও পাট রপ্তানি হচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত স্থলবন্দর দিয়ে নেপালে ২৪ হাজার ৫২৮ টন আলু এবং ১৭ হাজার ৬৩৩ টন পাট রপ্তানি হয়েছে। নেপালে বাংলাদেশি পাটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এছাড়া আমাদের দেশের লাল আলুও নেপালে বেশ জনপ্রিয়। এজন্য অন্য পণ্যের পাশাপাশি পাট ও আলু রপ্তানি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি-রপ্তানিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসায় পরিবহন, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতেও মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে।
স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী রাশেদ আলী সরকার জানান, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর অপার সম্ভাবনার চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর। ভারত, ভুটান ও নেপাল থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। পাথর নির্ভর হওয়ায় ভারত ও ভুটান থেকে পাথর আমদানি হয়ে থাকে। তবে কিছুদিন পাথর আমদানির পর আবার ভারত থেকে পাথর আসায় বন্দরটিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। প্রতিদিন পাথর আসছে। আশা করছি আমদানি-রপ্তানি আরও বৃদ্ধি পাবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ সুবিধা পেলে এই বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি আরও বাড়বে। স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী বাণিজ্যকেন্দ্র হতে পারে এটি। এমন কথা জানান বন্দরটির সিএন্ডএফ এজেন্টের অনেকে।
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশের স্থলবন্দরগুলোর মধ্যে বাংলাবান্ধা বন্দর অনেক সম্ভাবনার। বন্দরটি পাথর আমদানি নির্ভর হলেও বর্তমানে রপ্তানিতে এগিয়ে রয়েছে। পাট, আলু, প্লাস্টিক পণ্য, ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী ও কটন র্যাগস (গার্মেন্টস ঝুট) রপ্তানি বেড়েছে।
তিনি আরো বলেন, গত অর্থবছরের তুলনায় পণ্য আমদানি প্রায় দুই লাখ টন কমলেও আশার কথা হচ্ছে, পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টন। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০ টন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিসহ বন্দরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। এতে বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা স্টেকহোল্ডার আছেন, তারাও উপকৃত হয়েছেন।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাংলাদেশের এত কাছে ভারতে, নেপাল, ভূটান হওয়ার পরেও আমরা সম্পর্ক তৈরি করতে পারিনি। একটি অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। আমরা আশা রাখি বাংলাবান্ধার বন্দর একদিন বড় একটি বন্দরে রন্তারিত হবে।