
এমন চিত্র নওগাঁ শহরের পাইকারি মাছ বাজারের।
প্রবাদ আছে, ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। কারণ, মাছ বাঙালির একটু বেশিই প্রিয়। তাছাড়া নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় মাছের প্রাচুর্যতাও বেশি। তবে আজকাল ব্যস্ততার কারণে অনেকেই বাজার থেকে মাছ কেনার পর বাসায় গিয়ে তা কাটার ঝামেলা নিতে চান না। তাই মাছ কেনার পর অনেক ক্রেতাই এখন শরণাপন্ন হচ্ছেন মাছ কাটিয়াদের কাছে। স্থানীয়ভাবে তাদেরকে ‘মাছ কাটিয়া’ বা ‘মাছ কুটনি’ বলা হয়।
আজ বুধবার (২০ আগস্ট) সরেজমিন দেখা যায়, শহরের পাইকারি বাজারে মাছ কাটিয়ার কাজ করেন দশ থেকে
পনেরজন। মাছের আকার ভেদে কেজিপ্রতি মাছ কাটতে তারা নেন ২০ থেকে ৩০ টাকা।
তবে, এক কেজি ছোট মাছ কাটতে ৬০ থেকে ৭০ টাকা নেন। তাদের দিন-রাত মিলে গড়ে
আয় আয় হয় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। সপ্তাহের বন্ধের দিনগুলোতে বাজারে
ক্রেতা বেশি থাকায় কিছুটা বাড়তি আয় হয়। তাই সপ্তাহের বন্ধের দিনের আশায়
থাকেন তারা।
বাজার থেকে ক্রেতারা মাছ কিনে পাশেই ধারালো বটি নিয়ে বসে থাকা মাছ কাটিয়াদের কাছে দিচ্ছেন। তারা মাছ কেটে, ধুয়ে পরিষ্কার করে পলিথিন ব্যাগে ভরে দিচ্ছেন। বিনিময়ে মাছের আকারভেদে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা দিয়ে ক্রেতারা সেই মাছ বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। এমন চিত্র নওগাঁ শহরের পাইকারি মাছ বাজারের।
মাছের বাজারের পাশেই ধারালো বটি নিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসে মাছ কাটছেন সদর উপজেলার শাহাপুর গ্রামের বিনয় সরকারের ছেলে পরিতস সরকার। পরিতস বলেন, “আমার বাবা প্রায় ৭ বছর হলো এই ব্যবসা করেন। আমি বেকার ঘুরে বেড়াতাম। কিছুদিন আগে থেকে আমিও তাকে সময় দেই। প্রতিদিন মাছ কেটে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় হয়। ভাগ্য ভালো হলে ১৫০০-২০০০ টাকাও হয়।” এই আয় দিয়ে তাদের সংসার ভালোই চলছে বলেন পরিতস।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় অন্যের মাছ কাটাকেই নতুন কর্মসংস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন কিছু মানুষ। যদিও অন্যের মাছ কাটাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে এই শ্রমজীবীর প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন।
শহরের শাহাপুর এলাকার নিখিল সরকার। আগে তিনি মাছের ব্যবসা করতেন। তিনি বলেন, “স্বল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম, কিন্তু ব্যবসায় কয়েক চালানে লস হওয়ার কারণে সেই স্বল্প পুঁজি ও হারালাম। পরে দেখলাম আমাদের এলাকার অনেক মানুষ মাছ কাটার কাজ করে খুব ভালোভাবে দিন কাটাচ্ছে, আমি ও সেটা দেখে এই মাছ কাটার কাজে লেগে পরলাম “
তিনি বলেন, “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাছ কাটেন। তাতে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকার মত আয় হয়। এই আয়ে তিনি সন্তুষ্ট।”
নওগাঁ পাইকারি মাছ বাজারে মাছ কাটার কাজ করেন সদর উপজেলার শাহাপুর গ্রামের অন্তর সরকার। তিনি বলেন, “আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি তখন আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে পরে, এরফলে আমার পড়ালেখা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তখন আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না, আমার এলাকার এক বড় ভাইয়ের কাছে কাজের কথা বলতেই তিনি আমাকে মাছ কাটা কাজের আইডিয়া দেয়।”
এই পেশায় আয় কেমন হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাছ কাটলে ৮০০-১০০০ টাকা ইনকাম হয়। তবে শুক্রবার সরকারি ছুটি থাকার কারণে মাছের চাহিদা বেশি থাকে। সরকারি কর্মকর্তারা বাজার থেকে বেশি বেশি মাছ কুটে বাড়ি নিয়ে যান।”
শহরের পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ী বেলাল হোসেন বলেন, “বর্তমানে বাসায় কাজের লোকের সমস্যা। বাড়িওয়ালিও রান্নাবান্না আর ঘরের জরুরি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই সময় বাঁচাতে, বাজার থেকে মাছ কিনে পরিষ্কার করে নিয়ে যাচ্ছি। এতে করে বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না।”
শহরের মুক্তির মোড় এলাকার গৃহিণী রাজিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, “বর্তমানে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া, স্কুল, কোচিং এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। এরপর আবার রান্নাবান্নার কাজ করতে হয়। তাই মাছ কাটার তেমন সময় হয় না। বাড়তি ২০-৩০ টাকা খরচ হলেও সময় অল্প লাগে, ঝামেলা থেকেও বেঁচে যায়।”
শহরের পাইকারি মাছ বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহীম তোতা বলেন, “মাছ কেটেও যে সংসার চালানো যায় এটা আগে অনেকেই ভাবতেন না। বাজারে মাছ কেটে এবং মাছের আঁশ বিক্রি করে অনেকেই এখন স্বাবলম্বী।”
তিনি আরো বলেন, “সব পেশাতেই এখন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। আগে স্ত্রী ও মা চাচিরা বাড়িতে মাছ কাটতেন, এখন সেটা বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। ভবিষ্যতে গ্রামে-গঞ্জে শহরের মতো মেশিনের মাধ্যমে মাছ কাটা প্রথা চালু হতে পারে।”