
লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় সমগ্র বঙ্গের মানুষ জেগে উঠেছিল। হাতে হাত ধরে পথে নেমেছিলেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও অভিনেতা পর্যন্ত সবাই। এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চাপেই ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
সেই সময় কলকাতার রাস্তায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধর্মীয় বিভেদ ভুলে “বাংলার ঘরে যত ভাইবোন এক হোক” আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষ একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা ছড়িয়ে দেন।
তবে রাখিবন্ধনের শিকড় আরও গভীরে—ভারতীয় পুরাণ ও ইতিহাসে। ভবিষ্যপুরাণে বর্ণিত আছে, স্বর্গপুরীতে অসুরদের উৎপাত চরমে পৌঁছালে দেবরাজ ইন্দ্র, গুরু বৃহস্পতির পরামর্শে, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায় দৈত্যরাজ বলির সঙ্গে যুদ্ধে নামেন। যুদ্ধের আগে ইন্দ্রের স্ত্রী শচী দেবী মন্ত্রপূত রক্ষাবন্ধনী তাঁর হাতে বেঁধে দেন—যা রাখিবন্ধনের প্রাচীনতম পরিচিত রূপ।
মহাভারতেও আছে এক বিখ্যাত ঘটনা। যুদ্ধে কৃষ্ণের কবজিতে আঘাত পেয়ে রক্তপাত শুরু হলে দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে ক্ষত বাঁধেন। কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে তাঁকে ভগিনীসম্মান দেন। পরে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় অলৌকিকভাবে তাঁর সম্মান রক্ষা করেন।
বিষ্ণুপুরাণে আরেক কাহিনিতে দেখা যায়, দৈত্যরাজ বলির কাছে পরাজিত হলেও বিষ্ণুকে লক্ষ্মীর কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য মা লক্ষ্মী বলির হাতে রাখি বাঁধেন এবং ভাই হিসেবে সম্বোধন করেন। বলিও সাড়া দিয়ে বিষ্ণুকে মুক্তি দেন।
ইতিহাসেও রয়েছে রাখির মানবিক শক্তির দৃষ্টান্ত। আলেকজান্ডার ও রাজা পুরুর যুদ্ধে, পুরুর স্ত্রী ক্লিওফিস যুদ্ধের আগে আলেকজান্ডারের হাতে রাখি বেঁধে অনুরোধ করেন—যুদ্ধে জয়ী হলেও যেন পুরুর প্রাণ রক্ষা করেন।
১৫৩৫ সালে চিতোর আক্রমণের সময় চিতোরের রানি কর্ণাবতী সাহায্যের জন্য মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে রাখি পাঠান। বোনের পাঠানো সেই রাখির মর্যাদা রাখতে হুমায়ুন বাংলার অভিযান ছেড়ে রাজস্থানের পথে রওনা দেন, যদিও সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি।
আজকের দিনে রাখিবন্ধন মূলত ভাই-বোনের সম্পর্কের উৎসব হয়ে উঠেছে। রাখিপূর্ণিমায় বোনেরা ভাইদের হাতে পবিত্র সুতো বেঁধে তাদের মঙ্গল ও সুরক্ষার প্রার্থনা করেন। তবে শুধু হিন্দুরাই নয়, জৈন, বৌদ্ধ ও শিখ সম্প্রদায়ের মানুষও এ উৎসবে অংশ নেন।
মানুষে মানুষে বিভাজন যতই বাড়ুক না কেন—যদি রাখিবন্ধনের সৌভ্রাতৃত্বের চেতনা পারিবারিক পরিসর পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে মানবসভ্যতায় ভেদাভেদ হ্রাস পাবে, আর মানবতার বন্ধন আরও দৃঢ় হবে।
সূত্র: দীপান্বিতা দে (শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও প্রাবন্ধিক)
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ