
ইসলামে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি এমন কিছু নফল ও সুন্নত ইবাদত রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সম্ভব। এসব আমলে রয়েছে আত্মিক প্রশান্তি ও গোনাহ মোচনের প্রতিশ্রুতি। কেউ যদি গোনাহের ভারে কাতর হয়, তবে নিচের আমলগুলো আঁকড়ে ধরলে আল্লাহর রহমতে গোনাহ মাফের আশায় থাকতে পারে।
১. খাঁটি অন্তর থেকে ইস্তিগফার করাইস্তিগফার মানে হচ্ছে আল্লাহর কাছে গোনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া। এটি এমন এক আমল, যার জন্য নির্দিষ্ট সময়, স্থান বা পরিস্থিতির প্রয়োজন নেই—যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায়, যেকোনো অবস্থায় করা যায়।
কোরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
﴿وَمَن يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا﴾‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে অতীব ক্ষমাশীল ও দয়ালুরূপে পায়।’
(সুরা নিসা, আয়াত : ১১০)
হাদিসে বলা হয়েছে,
«طُوبَى لِمَنْ وَجَدَ فِي صَحِيفَتِهِ اسْتِغْفَارًا كَثِيرًا»
‘সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি, যার আমলনামায় বিপুল পরিমাণ ইস্তিগফার থাকবে।;
(ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩৮১৮)
নোট: ইস্তিগফারের একটি সুন্দর নিয়ম হলো—দিনে অন্তত ১০০ বার “أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ” পড়া।
২. রাতের তাহাজ্জুদের নামাজতাহাজ্জুদ হরো এমন এক নফল নামাজ, যা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়ে আদায় হয়। এটি আত্মশুদ্ধি ও গোনাহ মোচনের দারুণ উপায়।
কোরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
﴿وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ﴾
‘আর তারা শেষ রাতে ইস্তিগফার করে।
’
(সূরা যারিয়াত, আয়াত : ১৮)
হাদিসে বলা হয়েছে,
«أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الرَّبُّ مِنَ الْعَبْدِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ الآخِرِ، فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَكُونَ مِمَّنْ يَذْكُرُ اللَّهَ فِي تِلْكَ السَّاعَةِ فَكُنْ»
‘শেষ রাতের মধ্যভাগে আল্লাহ বান্দার সবচেয়ে নিকটবর্তী হন। তুমি যদি তখন আল্লাহর যিকির করতে পারো, তাহলে করো।’
(তিরমিযি, হাদিস: ৩৫৭৯)
৩. ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ইত্যাদি যিকির বেশি বেশি করাযিকির হলো হৃদয়ের শুদ্ধি। এটি এমন এক আমল, যার মাধ্যমে গোনাহ ঝরে পড়ে।
হাদিসে বলা হয়েছে,
«سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، تَحُطُّ الْخَطَايَا كَمَا يُحَطُّ وَرَقُ الشَّجَرِ»
‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে গোনাহ এমনভাবে ঝরে পড়ে, যেমন গাছের পাতা ঝরে পড়ে।;
(মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ২১৩৯৮)
এছাড়াও সকাল-সন্ধ্যার যিকির বা মাসনূন দোয়াগুলোও নফল আমল হিসেবে গোনাহ মাফে অনেক সহায়ক।
৪. ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ ও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বেশি বেশি বলাএই দু’টি শব্দ খুব সংক্ষিপ্ত হলেও, আখিরাতে তার প্রতিদান অত্যন্ত বড়।
হাদিসে বলা হয়েছে,
«إِنَّهُ لَيُغْفَرُ لِلرَّجُلِ وَمَا يُبَالِي، مَا لَمْ يُصِبْ دَمًا حَرَامًا»
‘এক ব্যক্তি যতই গোনাহে লিপ্ত থাকুক, যদি সে নিরপরাধের রক্ত না ঝরায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।’
(বুখারি, হাদিস: ৬৮৬৪)
এ ছাড়াও আমরা জানি যে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হচ্ছে তাওহীদের মূল। যা তার নিজস্ব আলোতেই গোনাহ মুছে দেয়।
হাদিসে বলা হয়েছে,
«قُولُوا: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ تُفْلِحُوا»
‘তোমরা বলো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’—তবে সফল হবে।’
(মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ১৬৫৮৬)
৫. কারো দোষ গোপন করা ও ক্ষমা করে দেওয়ামানবিক গুণাবলির মধ্যেও এমন কিছু রয়েছে, যেগুলো দ্বারা আল্লাহ বান্দার গোনাহ ক্ষমা করে দেন।
হাদিসে বলা হয়েছে,
«مَن سَتَرَ مُسلِمًا، سَتَرَهُ اللَّهُ في الدُّنيا والآخرة»
‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন করবেন।’
(মুসলিম, হাদিস: ২৫৯০)
কোরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,
﴿فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾
‘যে ব্যক্তি ক্ষমা করে ও মীমাংসা করে, তার প্রতিদান আল্লাহর উপর।’
(সুরা শূরা, আয়াত : ৪০)
৬. নফল রোজা রাখা (বিশেষ করে আরাফা ও আশুরা)নফল রোজা এমন আমল, যার সঙ্গে গোনাহ মোচনের সুসংবাদ জড়িত।
হাদিসে বলা হয়েছে,
‘আরাফার রোজা বিগত ও আগত এক বছরের গোনাহ মোচনের মাধ্যম।’ ‘আশুরার রোজা গত বছরের গোনাহ মাফ করে দেয়।’
( মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
৭. সাদাকা ও গোপনে সাহায্য করাসাদাকা কেবল দারিদ্র্য বিমোচনের উপায় নয়, এটি আখেরাতের আগুন নিভানোর এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
হাদিসে বলা হয়েছে,
«الصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ، كَمَا يُطْفِئُ الْمَاءُ النَّارَ»
‘সাদাকা গোনাহ নিভিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়।’
(তিরমিযি, হাদিস: ২৬১৬)
আল্লাহর করুণার দরজা খোলা, তাঁর দয়া সীমাহীন। বান্দা যতবারই গোনাহ করুক না কেন, যদি সে আন্তরিকভাবে নফল ও সুন্নত আমলের দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তা মাফ করে দিতে প্রস্তুত থাকেন। আল্লাহ বলেন-
﴿إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ﴾
‘নিশ্চয়ই তোমার রব্ অবারিত ক্ষমাশীল।’
(সুরা আন-নাজম, আয়াত :৩২)
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর