প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই, ২০২৫, ২:৫৬ পিএম

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বিখ্যাত মন্ডা এখন আর কেবল একটি মিষ্টি নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয়ের এক গর্বিত প্রতীক। সম্প্রতি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় এর ২০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য ও স্বাদ পেয়েছে আন্তর্জাতিক মর্যাদা। একসময় যা ছিল কেবলই রাজপরিবারের খাবার, আজ তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে মিষ্টান্নপ্রেমীদের কাছে সমাদৃত।
জিআই স্বীকৃতি: ঐতিহ্য ও মানের সুরক্ষা
বেশ কিছুদিন আগেই মুক্তাগাছার মন্ডা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই স্বীকৃতির ফলে মুক্তাগাছার মন্ডার ভৌগোলিক উৎস, এর প্রস্তুত প্রণালী এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আইনগতভাবে সুরক্ষিত হলো। এর ফলে, এই নামের অপব্যবহার রোধ করা সহজ হবে এবং বিশ্ববাজারে এর ব্র্যান্ডিং আরও শক্তিশালী হবে। এটি শুধু পাল পরিবারের সাফল্য নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের জন্যই এক বিরাট অর্জন।
ইতিহাসের পাতা থেকে
মুক্তাগাছার মন্ডার ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দীর পুরনো। ১৮২৪ সালে গোপাল পাল নামক এক মিষ্টির কারিগর এই অতুলনীয় স্বাদের মিষ্টি প্রথম তৈরি করেন। এর উৎপত্তির পেছনে জড়িয়ে আছে এক আধ্যাত্মিক কাহিনি। গোপাল পালের বংশধরদের মতে, তিনি এক সাধুর কাছ থেকে স্বপ্নে এই মন্ডা তৈরির প্রণালী পেয়েছিলেন। সেই সাধু তাঁকে শুধু রেসিপিই দেননি, বরং দোকান প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত স্বপ্নে এসে নানা নির্দেশনা দিতেন বলেও প্রচলিত আছে।
তৎকালীন মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী এই মন্ডা খেয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি এর ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং একে রাজপরিবারের অন্যতম প্রধান মিষ্টান্ন হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সেই থেকে দীর্ঘদিন এই মন্ডা ছিল কেবল রাজবাড়ির অতিথি আপ্যায়ন ও পূজা-পার্বণের অনুষঙ্গ। রাজপ্রথা বিলুপ্তির পর এর স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পায় সাধারণ মানুষ।
স্বাদ ও স্বাতন্ত্র্য
মুক্তাগাছার মন্ডার বিশেষত্ব হলো এর প্রস্তুত প্রণালী। খাঁটি দুধের ছানা ও চিনির মিশ্রণে তৈরি এই মিষ্টিতে কোনো প্রকার জল বা ভেজাল ব্যবহার করা হয় না। এটি শুষ্ক প্রকৃতির এবং হালকা বাদামী রঙের হয়। এর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ফ্রিজে না রেখেও স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বেশ কয়েকদিন ভালো থাকে, যা এর গুণগত মানকে স্বতন্ত্র করেছে।
ঐতিহ্য আজও বহমান
বর্তমানে গোপাল পালের পঞ্চম প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। মুক্তাগাছার মূল দোকানে আজও প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করেন এই ঐতিহাসিক মিষ্টির স্বাদ নিতে। ময়মনসিংহ শহর থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় পর্যটকদের জন্যও এটি একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।
একসময় যা ছিল জমিদারদের খাবার, আজ তা জিআই স্বীকৃতির মাধ্যমে হয়ে উঠেছে সমগ্র বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও গর্বের প্রতীক, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তার সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম