
একসময় যেখানে ছিল প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পদচারণা, সেখানে এখন কেবল সুনসান নীরবতা। ঝোপঝাড়ে ঢাকা, বিষাক্ত লতায় আচ্ছাদিত, সাপের বাসা আর ভাঙা দরজার শব্দে কেঁপে ওঠা একটি ভৌতিক পরিবেশ।
এটাই এখনকার বলরাম কুটির- নরসিংদীর বেলাব উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে অবস্থিত দেড়শ বছরের পুরনো এক ঐতিহাসিক ভবনের নাম।
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত বলারাম কুটির একসময় ছিল নির্মাণশৈলীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিস্তৃত আঙিনা, দোতলা ভবনের ভারি কাঠের দরজা-জানালা আর কারুকার্যখচিত নকশা- সব মিলিয়ে এক আভিজাত্য ছিল এই কুটিরে। স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিল ‘বলরাম শাহের বাড়ি’ নামে।
ভবনটির মূল ফটকে এখনো ঝুলে আছে ‘বলারাম কুটির’ লেখা নামফলক। তবে সেটিও আজ ঢাকা পড়ে গেছে ঘন লতা-পাতায়। পলেস্তারা খসে পড়ছে, ছাদের ফাটল দিয়ে গাছের শিকড় ঝুলছে, কাঠের কাঠামো ভেঙে পড়েছে- সব মিলিয়ে ভবনটি এখন রীতিমতো ধ্বংসস্তূপ।
বলারাম কুটির শুধু একটি প্রাচীন বাড়িই নয়, এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বহন করছে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই ভবনে হয়েছিল গোপন বৈঠক, যোদ্ধাদের রাতযাপন এবং আশ্রয় গ্রহণ। তাই বলারাম কুটির একাধারে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের নীরব সাক্ষী।
একসময় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের আনাগোনায় মুখর ছিল এই বাড়ি। সেই দিন আজ শুধুই স্মৃতি। চারপাশে আগাছা, কাঁটাঝোপ আর বিষাক্ত প্রাণীর আনাগোনা- মানুষজন ভয়েও ঘেঁষে না। কালের পরিক্রমায় আজ ভূতুড়ে বাড়ি হয়ে গেছে বলারাম কুটির।
বেলাবের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি অন্যতম নিদর্শন বলারাম কুটির। স্থানীয়রা মনে করেন, সরকার চাইলে এটি সংস্কার করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। এতে একদিকে যেমন ভবনটি সংরক্ষিত হবে, তেমনি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা যাবে তাদের শিকড় ও সংগ্রামের ইতিহাস।
বলরাম কুটির ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। অথচ প্রয়োজন শুধু সঠিক উদ্যোগ, প্রশাসনের নজরদারি এবং ইতিহাস-সংরক্ষণের সদিচ্ছা। না হলে খুব শিগগিরই হারিয়ে যাবে এক গৌরবোজ্জ্বল অতীত, মুছে যাবে মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত সাক্ষ্য।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমএম