
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক আগ্রাসনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমর্থন ও জড়িত থাকার পাকা প্রমাণ রয়েছে।
রোববার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের হাতে মার্কিন বাহিনী ও তাদের ঘাঁটিগুলো থেকে ইসরায়েলকে দেওয়া সমর্থনের সুস্পষ্ট ও শক্ত প্রমাণ রয়েছে।’’
আরাকচি আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি ইসরায়েলি হামলার বিষয়টি জানতেন এবং এই হামলাগুলো মার্কিন অস্ত্র ও প্রযুক্তি ছাড়া সম্ভব হতো না। তাঁর ভাষায়, ‘‘তাই আমাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার অংশীদার এবং তাদের এর দায় স্বীকার করতে হবে।’’
তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে দাবি করেছে তারা ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সঙ্গে যুক্ত নয়। তবে আরাকচি বলেন, ‘‘প্রাপ্ত তথ্য তার বিপরীতটা প্রমাণ করে, তাই আমরা এই দাবি বিশ্বাস করি না।’’
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা অপরাধ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই এই হামলার নিন্দা জানাতে হবে যদি তারা পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে আন্তরিক হয়।
আরাকচি জানান, ইসরায়েল তেহরান ও অন্যান্য শহরে আবাসিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যার ফলে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৮০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সাধারণ নাগরিক, সামরিক কর্মকর্তা, পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রয়েছেন।
ইরান প্রতিশোধ হিসেবে গত দুই রাতে ইসরায়েলের তেলআভিভ ও হাইফায় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যাতে অন্তত ১০ জন নিহত এবং বহু আহত হয়েছেন।
রোববার দিবাগত রাতে ইসরায়েল তেহরানের পশ্চিমাঞ্চল শেহরান এলাকায় একটি জ্বালানির গুদামে হামলা চালায়, যেখানে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। এছাড়া বুশেহর প্রদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্সের ফেইজ-১৪-তে হামলা চালানো হয়েছে।
আরাকচি এসব হামলাকে ‘‘কৌশলগত বড় ভুল’’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে ইসরায়েল পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের মধ্যে টেনে নিতে চাইছে।
“পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা গোটা অঞ্চল এমনকি পুরো বিশ্বকেও জড়িয়ে ফেলতে পারে,”— বলেন তিনি।
'যুদ্ধ থামাতে প্রস্তুত, যদি ইসরায়েল থামে'
তেহরানে রোববার ভোরে বিস্ফোরণ ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শব্দ শোনা যায়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইরানিদের হুঁশিয়ার করে বলেছে, তারা যেন ‘সামরিক অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের’ আশপাশ থেকে সরে যায়, না হলে প্রাণ হারাতে হতে পারে।
তবে আরাকচি বলেন, ইসরায়েল হামলা বন্ধ করলে ইরানও আক্রমণ বন্ধে প্রস্তুত। পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে এসে ইসরায়েলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাতে আহ্বান জানান।
এদিকে রোববার ইরানের সংবাদপত্রগুলো প্রথম পাতায় যুদ্ধের খবর ছাপিয়েছে। কায়হান পত্রিকা লিখেছে, “আমরা যুদ্ধ ও ইসরায়েল একসঙ্গেই শেষ করব”। হাম-মিহান লিখেছে, “জাতীয় যুদ্ধ”; আর এতেমাদ বলেছে, “ইসরায়েল বিস্ফোরক মাইনফিল্ডে পা ফেলেছে”।
তেহরান সিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেহদি চামরান বলেছেন, রাজধানীতে আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় মানুষকে ৮০’র দশকের ইরাক যুদ্ধের সময়কার মতো মেট্রো স্টেশন ও গ্যারেজ ব্যবহার করতে হতে পারে।
সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, সব ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাতিল, এবং প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
রোববার ইরানের রিয়াল আরও অবমূল্যায়িত হয়েছে—ইসরায়েলি হামলার আগে যেখানে ১ ডলার = ৮,৪০০০০ রিয়াল ছিল, তা এখন গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯,৫৫০০০ রিয়ালে।
তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জ রোববার বন্ধ ছিল। সোমবার তা খোলা হবে কি না—সেটা নির্ভর করছে রাতের পরিস্থিতির ওপর।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ