
প্রতীকী ছবি
প্রত্যেক মানুষের একটি নিজস্ব চরিত্র থাকে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। প্রত্যেকের চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি, অনুভূতি একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাই আমাদের উচিত এই বিভিন্ন ব্যক্তিত্বগুলোকে বুঝে নেওয়া। তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা, যাতে করে তাদের সাথে সুন্দরভাবে, কম ক্ষতির মাধ্যমে ইতিবাচক ফল পাওয়ার মতো আচরণ করতে পারি।
নিম্নে বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিদের ব্যক্তিত্ব, তাদের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের সাথে কীভাবে আচার ব্যবহার করতে হবে, তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হলো-
১. রূঢ় বা কঠোর ব্যক্তি▪️বৈশিষ্ট্য:
- ব্যবহার অমানবিক এবং অনেক সময় নিজের সাথেও কঠোর।
- অন্যদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করে না। কারণ সে তাদের বিশ্বাস করে না।
- অন্যদের কথার মধ্যে বারবার বাধা দেয়, তার মতামতে অনড়।
- নিজেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে চায়।
- অহংকারী; এজন্য মানুষ তাকে পছন্দ করে না।
- নিজের মতামত নিয়ে দৃঢ়চেতা।
- মনে করে সে ঠিক আছে, বাকিরা ভুল।
▪️কীভাবে আচার ব্যবহার করবেন:- ধৈর্য ধরে নিজেকে শান্ত রাখুন।
- মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনুন।
- মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে তার সঙ্গে আলাপ করুন।
- তাকে উত্তেজিত না করে, ভদ্রভাবে যুক্তির মাধ্যমে কথা বলুন।
- তার ধারণা ও তথ্য আলোচনায় কাজে লাগান।
- নিজের মতামত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরুন।
- তাকে বোঝান, সম্মান পেতে হলে অন্যকে সম্মান দিতে হয়।
- প্রাসঙ্গিক কুরআনের আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করুন।
২. সহজ সরল ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যক্তি▪️বৈশিষ্ট্য:
- শান্ত স্বভাবের, হাসিখুশি এবং সহজে উত্তেজিত হয় না।
- অন্যদের এবং নিজের উপর বিশ্বাস রাখে।
- প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে।
- সরল, অতিথিপরায়ণ এবং সবাই তাকে পছন্দ করে।
- এলোমেলো, সময়নিষ্ঠ নয়, সময়ের প্রতি উদাসীন।
- মিশুক, হাসিখুশি এবং রসিক।
- নিরাপত্তাবোধে বিশ্বাসী।
- কাজের কথা এড়িয়ে চলে।
- মনে করে, সে এবং অন্যরাও ভালো আছে।
▪️কীভাবে আচার ব্যবহার করবেন:- সম্মানের সাথে সাক্ষাৎ করুন এবং মনোযোগ দিন।
- আলোচনাকে নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখুন।
- কথাবার্তা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালনা করুন।
- প্রয়োজনে গম্ভীর আচরণ করুন।
- সময়ের গুরুত্ব তাকে বোঝান।
৩. দ্বিধাগ্রস্ত বা অনিশ্চিত ব্যক্তি▪️বৈশিষ্ট্য:
-আত্মবিশ্বাসের অভাব।
- লাজুক, চিন্তিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
- সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।
- বিকল্পের মধ্যে হারিয়ে যায়।
- নিয়মকানুনের উপর নির্ভর করে।
- অনেক প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু সময়মতো পালন করে না।
- অতিরিক্ত তথ্য ও নিশ্চয়তা চায়।
- মনে করে, সে ভালো নয় কিন্তু অন্যরা ভালো।
▪️কীভাবে আচার ব্যবহার করবেন:- তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলুন।
- তার দ্বিধা ও লজ্জা দূর করতে পিতৃসুলভ আচরণ করুন।
- সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করুন ও দেরির ক্ষতি বুঝিয়ে দিন।
- পর্যাপ্ত তথ্য দিন।
- বারবার নিশ্চয়তা ও সাহস দিন।
-বোঝান, দ্বিধা তাকে ও তার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- তাকে বলুন, দৃঢ়চেতা হওয়া একজন ব্যক্তির সম্মানের উপাদান।
৪. ধীর প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তি▪️বৈশিষ্ট্য:
- শান্ত, যার সাথে বোঝাপড়া কঠিন।
- মনোযোগী শ্রোতা এবং বুঝতে সক্ষম।
- সহজে বিরোধিতা করে না।
- প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে চলে।
- নিরাবেগ, নির্লিপ্ত।
▪️কীভাবে আচার ব্যবহার করবেন:- তার মতো ধীর পদ্ধতিতে কথা বলুন।
- উন্মুক্ত প্রশ্ন করুন যা দীর্ঘ উত্তর চায়।
- চুপ থেকে তাকে উত্তর দিতে বাধ্য করুন।
- ধীরে ধীরে তার সঙ্গে অগ্রসর হন।
- সম্মান ও সৌহার্দ্য প্রকাশ করুন।
৫. আক্রমণাত্মক ও ঝগড়াটে ব্যক্তি▪️বৈশিষ্ট্য:
-আক্রমণাত্মক এবং সমস্যা তৈরি করে।
-সহজেই উত্তেজিত হয়।
- নিজের উপর নির্ভরশীল, অন্যের কথা মানে না।
- মুখ ভার, মেজাজ খারাপ ও স্নায়ুবিক চাপগ্রস্ত।
- অন্যদের এবং তাদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে।
- ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা রাখে।
- উচ্চস্বরে চেঁচামেচি করে অন্যকে ভীত করতে চায়।
▪️কীভাবে ব্যবহার করবেন:- ধৈর্য সহকারে তার কথা শুনুন যাতে তার রাগ প্রশমিত হয়।
- নিজে শান্ত থাকুন, উত্তেজিত হবেন না।
- ব্যক্তিগতভাবে কিছু নেবেন না।
- নিজের মতামত যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করুন।
- আলোচনাকে মূল বিষয়ে ফেরত আনুন।
- যুক্তি ব্যবহার করুন, আবেগ নয়।
- হাস্যোজ্জ্বল থাকুন এবং হালকা পরিবেশ বজায় রাখুন।
৬. জ্ঞানপাপী বা সবজান্তা ব্যক্তি▪️বৈশিষ্ট্য:
- অন্যদের কথা বিশ্বাস করে না, সবসময় বিরোধিতা করে।
- অহংকারী, কথা বলার উপর আধিপত্য চায় এবং উপহাস করে।
- জেদি ও নিজের মতেই স্থির।
- নিজের গুণগান গাইতে ভালোবাসে।
- সন্দেহপ্রবণ ও অন্যদের উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয়ে থাকে।
- এমনকি আপনার নিজের কাজ সম্পর্কেও উপদেশ দেয়।
▪️কীভাবে আচার ব্যবহার করবেন:- ধৈর্য ধরে নিজেকে শান্ত রাখুন।
- তার মন্তব্য মেনে নিয়ে ধৈর্যের সাথে নিজের বক্তব্য চালিয়ে যান।
- সুযোগমতো তার প্রশংসা করুন।
- নির্দিষ্ট সময়ে তাকে থামান।
- সব সময় বাস্তববাদী হবেন না।
- প্রতিশোধ নেয়ার কথা ভাববেন না।
৭. বিরোধী বা প্রতিবাদী ব্যক্তি▪️বৈশিষ্ট্য:
- অন্যদের প্রতি উদাসীন, ফলে খারাপ প্রভাব ফেলে।
- আত্মবিশ্বাসের অভাব; নেতিবাচকভাবে নিজের মতামত দেয়।
- রক্ষণশীল, নতুন কিছুতে আগ্রহ নেই।
- কল্পনাশক্তির অভাব, নতুনত্ববিহীন।
- জেদি, কঠোর, বারবার আপত্তি তোলে।
- অতীতকে বারবার উল্লেখ করে।
- নিয়মকানুনে আঁকড়ে ধরে, নিজের আমিত্বে বিশ্বাসী।
- ব্যর্থতার ভয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না।
▪️কীভাবে ব্যবহার করবেন:- ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে তার মত জানুন।
- নিজের মতামত যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে তুলে ধরুন।
- বলুন আপনার হাতে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে।
- তাকে মাঝপথে বাধা দিতে দেবেন না।
- নতুন ধারণা ধীরে ধীরে দিন।
- ধৈর্য ধরুন।
৮. অহেতুক বা অতিরিক্ত কথা বলা ব্যক্তি▪️বৈশিষ্ট্য:
- অনেক কথা বলে, সব বিষয়ে কথা বলতে চায়।
- নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
- নিজেকে বড় করে দেখাতে চায়, কিন্তু দুর্বল।
- আসল বিষয়ে না গিয়ে অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলে।
- বহু ভুল করে।
- কল্পনাশক্তিতে ভর করে নিজের মত প্রমাণ করতে চায়।
▪️কীভাবে আচার ব্যবহার করবেন:- মাঝপথে থামিয়ে বলুন: “স্যার, আমরা কি মূল বিষয় থেকে সরে যাচ্ছি না?”
- সময়ের গুরুত্ব বোঝান।
- ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বোঝান আপনি অস্বস্তি বোধ করছেন।
এটাই আমাদের জন্য শিক্ষণীয় যে, প্রতিটি ব্যক্তিত্বের ধরন অনুযায়ী আচার আচরণে ব্যবহারিক কৌশল পরিবর্তন করতে হয়। মহান আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞান রাখেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এনআর