
“শুষ্ক বালি, ডালপালা ক্লান্ত, চাতক মাখছে রোদ, তপ্ত বাতাস, আগুন হাওয়া...”—কবিতার এই চিত্রই যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহে নাকাল জনজীবন। একটানা প্রচণ্ড গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষ, প্রাণিকুল ও প্রকৃতি।
তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকলেও বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় গরম অনুভূত হচ্ছে আরও বেশি। রাস্তাঘাট, কর্মস্থল, বাসা—সব জায়গাতেই ভ্যাপসা গরম। ৫ মিনিট রোদে দাঁড়ালেই ঘামে ভিজে যাচ্ছে শরীর। সূর্যের তীব্রতা এতটাই যে দিনের বেলা রাস্তায় চলাচল করাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
বুধবার রাজশাহীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মাঝারি তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য। বৃহস্পতিবার (১২ জুন) বগুড়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬.৬ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন ২৮.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এমন গরম বর্ষাকালেও বিরল নয়, তবে সম্প্রতি এ প্রবণতা বেড়েছে। আগামী রোববার থেকে আষাঢ় মাস শুরু হলে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা তাপমাত্রা কিছুটা কমাতে পারে।
এদিকে ঈদের ছুটি শেষে ধীরে ধীরে শহরে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ছে। যদিও অধিকাংশ অফিস-আদালত ও দোকানপাট পুরোদমে খুলবে রোববার থেকে, তবু প্রয়োজনীয় কাজে অনেকেই রোদ উপেক্ষা করে রাস্তায় বের হচ্ছেন। কেউ ছাতা মাথায় দিয়ে, কেউ মুখে পানি ছিটিয়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছেন।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ছিন্নমূল ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষ। কাজের জন্য ঘর থেকে বের হলেও বেশি সময় রোদে টিকে থাকা যাচ্ছে না। রিকশাচালকরা রোদ উপেক্ষা করে যাত্রী বহন করছেন, আবার কেউ কেউ রাস্তায় জিরিয়ে নিচ্ছেন। শিশু-কিশোররা গরম থেকে মুক্তি পেতে পুকুর-নদীতে নেমে জলকেলিতে মেতে উঠেছে।
তীব্র গরমে চাহিদা বেড়েছে ঠান্ডা পানীয়, ডাব, দই ও ঘোলের। তবে চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দামও। অন্যদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ভোগান্তিতে ফেলছে মানুষকে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক এলাকায় নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপ ও সেচযন্ত্রে পানি উঠছে না। বৃষ্টির অভাবে উদ্বেগে পড়েছেন মাছচাষিরাও।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গরমে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। রোদ এড়িয়ে চলা, সুতির কাপড় পরিধান এবং পর্যাপ্ত পানি পানের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
পরিবেশবিদদের মতে, এই রুদ্র প্রকৃতির পেছনে দায়ী মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ড—অবাধ বৃক্ষনিধন, বন উজাড় ও পাহাড় কাটা। প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এখনই ব্যাপক বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন তারা।
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ