
শলা ঝাড়ু এবং ফুল ঝাড়ুর কারখানা
ঝাড়ু শিল্পকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজারে গড়ে উঠেছে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ১০ টি শলা আর ফুল ঝাড়ুর কারখানা। পুঁজির অভাবে বন্ধের পথে বাপ দাদার পেশা।
বর্তমানে কারখানাগুলোতে প্রায় অর্ধশত নারী ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। পুঁজির অভাবে চাহিদা মত ঝাড়ু উৎপাদন করতে পারছেনা মহাজনরা। এই ঝাড়ুর চাহিদা বাড়লেও পুঁজির অভাবে চাহিদা মতো ঝাড়ু উৎপাদন করতে না পারায় বন্ধের পথে সবগুলো কারখানা।
কারখানা মালিকরা বলেন, “সরকারের সহযোগিতায় কারখানাগুলো প্রসারিত করা গেলে হতে পারে অনেক লোকের কর্মসংস্থান। আর্থিক অনুদান চেয়ে আবেদন করলে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের অনুদান দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে বললেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন।”
সরেজমিনে জানা যায়, যুগের পর যুগ ধরে ভৈরব বাজারের ঋষি পট্টিতে বসবাস করছেন সনাতন ধর্মের ১২০ টি পরিবার। তাদের মধ্যে অনেকেই জড়িয়ে আছেন সলা আর ফুল ঝাড়ু তৈরির পেশায়। একেকটি কারখানায় নারী পুরুষ মিলিয়ে ৫ থেকে ১০ জন করে শ্রমিক কাজ করছেন। একেকটি ঝাড়ু তৈরি করে পারিশ্রমিক পান ৬ টাকা করে। কারিগরদের অনেকেই প্রতিদিন কম করে হলেও ১ শত পিস ঝাড়ু তৈরি করে থাকে। পরিমাণ ভেদে একেকজন কারিগর ৬’শ থেকে ৮’শ টাকা আয় করছেন। এ টাকাতেই চলে তাদের সংসার। গ্রাম থেকে শহরের সর্বত্রই এখন ফুল ঝাড়ুর চাহিদা বেশি। অফিস, বাসা-বাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে নিত্য দিনই ব্যবহার হয়ে থাকে ফুল ঝাড়ু। অপরদিকে গৃহস্থালি কাজে শলা ঝাড়ুর গুরুত্ব কম না। এখানকার উৎপাদিত ঝাড়ু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন জেলা উপজেলায়। পাইকারি দরে একেকটি ঝাড়ু প্রকার ভেদে ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ শত টাকায়। বরিশাল থেকে নারিকেলের শলা আর চট্টগ্রাম থেকে ফুল ঝাড়ুর উপকরণ এনে তৈরি করছেন এখানকার কারিগররা।
কারখানা মালিক আকাশ দাশ বলেন, “কৃষক আর কৃষি নিয়েই মূলত ঐতিহ্যবাহী গ্রাম বাংলা আমাদের দেশ। আমাদের দেশ কৃষি নির্ভর দেশ। এক সময় দেশে সব খানেই শলা ঝাড়ু ব্যবহার হতো। বর্তমানে বেশির ভাগই এখন পাকা বাসা-বাড়ি। তাই শলা ঝাড়ুর ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই কমে গেছে। তবে কৃষি কাজ, গৃহস্থের কাঁচা ঘর বাড়ির উঠোন, ব্রয়লার চাতাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজেই এসব শলা ঝাড়ুর ব্যবহারই বেশি।”
মহাজন সুশান্ত কুমার বলেন, “এক মাসের মাল তৈরি করতে হলে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পুঁজির দরকার। পুঁজি থাকলে কারখানাটি আরো বড়ো-সড়ো করতে পারতাম। মালের চাহিদা অনেক বেশি। কারখানা বড় হলে বেশ কিছু লোক কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে পারতো।”
অপর মালিক রাজিব চন্দ্র ঋষি দাশ বলেন, “ঝাড়ু ব্যবসা একটা প্রচলিত ব্যবসা। আমাদের পূর্ব পুরুষদের পেশা হিসেবে আমরা কয়েকটি পরিবার এ পেশাটাকে এখনো ধরে রেখেছি। দিন দিন পাকা ঘরবাড়ি বাড়তে থাকায় ফুল ঝাড়ুর চাহিদা বাড়ছে। পুঁজি থাকলে কারখানা আরো বৃদ্ধি পেতো। আর কারখানা বাড়লে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হতো। এটাকে আরো বড় পরিসড়ে করতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন। এত টাকাও জোগান দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর্থিক সহায়তা পেলে এ পেশাকে আরো বড় আকারে করা যাবে।”
শিশু কর্মকার বলেন, “প্রতিদিন তিনশ মাল বানাতে পারি। এতে আমার ছয়শত টাকা রুজি হয়। এ টাকায় পরিবার নিয়ে কোনো রকমে চলতে পারি।”
শ্রমিক যোগেন বলেন, “নারিকেলের শলা আসে বরিশাল থেকে। মহাজনরা এই বাজার থেকে ক্রয় করে এনে ঝাড়ু তৈরি করেন। তাই মহাজনদের তেমন একটা পোষায় না। ঝাড়ুর চাহিদা অনেক বেশি। টাকার অভাবে পাইকারদের চাহিদা মত মাল দিতে পারে না।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শবনম শারমিন বলেন, “আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে জানতে পেরেছি বাজারে বেশ কয়েকটি শলা ও ফুল ঝাড়ু শিল্প রয়েছে। অর্থের অভাবে ঐ শিল্পগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য চেয়ে কেউ কোনো আবেদন করেনি। যদি আবেদন করে তাহলে যাচাই-বাছাই করে ঝাড়ু শিল্পকে আরো বড় পরিসড়ে করার জন্য আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করা হবে। যাতে করে ঝাড়ু শিল্পে যেন অনেকেরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।”
স্বদেশ প্রতিদিন/আইএমএস