
ঢাকার উপকণ্ঠ শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগসহ তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা পরিচয় গোপন করে এখন অনেকেই সাংবাদিক বনে গেছেন। তাদের অনেকেই সাংবাদিক সেজে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে অন্তবর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে নানারকম উস্কানিও দিচ্ছেন।
সম্প্রতি তথাকথিত ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ের আড়ালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তারা। নিয়মিতভাবে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা সমন্বয়কারীরাও তাদের ষড়যন্ত্রের নিশানা থেকে বাদ যাচ্ছে না।
থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও অভিযোগ জমা পড়লেও, এখনও পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বরং অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের বিরুদ্ধেও এই অপপ্রচারকারীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার ছড়াচ্ছে।
প্রশ্ন হলো সাংবাদিক পরিচয় দানকারী এই সকল আওয়ামী দোসরদের থামাবে কে?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আশুলিয়া থানা শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক ও জাতীয় শ্রমিক লীগের আঞ্চলিক কমিটির সদস্য নাজমুল হক ইমু, তার বিশেষ সহকারী সাব্বির আহমেদ, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরাসরি গুলি করা আওয়ামী লীগ নেতা সুমন ভূইয়ার অনুসারী তিস্তা বাবু ও সোহেল রানা এই অপপ্রচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, চালিয়ে যাচ্ছে ভয়ংকর অপপ্রচার।
সম্প্রতি শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার শিমুলিয়া এলাকায় ঘুরতে গিয়ে অপকর্মের প্রতিবাদ করায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ৯ ছাত্রনেতার ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেই হামলার ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিয়ে হামলার শিকার ছাত্র নেতাদের চাঁদাবাজ বানানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে তারা। হামলার শিকার ছাত্র নেতাদের চাঁদাবাজ বানাতে বেশ কিছু ভুঁইফোর মিডিয়ায় সংবাদও প্রকাশ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছে। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে হতভম্ভ হয়ে যাচ্ছেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
এছাড়া, সমাজের বিশিষ্টজন, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও অপপ্রচারের অভিযোগে নাজমুল হক ইমুর সহকারী সাব্বির আহমেদের নামে থানায় রয়েছে অন্তত পাঁচটি জিডি ও একাধিক লিখিত অভিযোগ। তবুও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি।
একইভাবে, একই চক্রের সদস্য হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ কর্মী তিস্তা বাবু ও সোহেল রানা—যারা
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরাসরি গুলি করা আ.লীগ নেতা ও ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুমন ভূইয়ার অনুসারী হিসেবে কাজ করেন—তাদের বিরুদ্ধেও একাধিক জিডি ও অভিযোগ থাকলেও, তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
পুলিশ ব্যবস্থা নিবে কিভাবে, তাদের অপপ্রচারের ভয়াবহতা এতটাই বিস্তৃত যে, আশুলিয়ার এই চিহ্নিত চক্র থেকে রেহাই পাচ্ছে না খোদ পুলিশও। তাদেরকে কোনো অভিযোগ বা জিডির ব্যাপারে ডাকা হলে, উল্টো সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়েই শুরু হয় ফেসবুক ও অনলাইন মাধ্যমে মনগড়া অপপ্রচার।
জানা যায়, আশুলিয়া থানার অন্তত পাঁচজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) এই চক্রের অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। তবে তারা সরকারি দায়িত্বের কারণে মুখ খুলতে পারছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এসআই বলেন, 'কিছুদিন আগে আমার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব অপপ্রচার চালানো হয়, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। শুধু তাই নয়, আমার জায়গায় আমার এক সহকর্মীর ছবি ব্যবহার করে ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করে তারা।'
সাভারের স্থানীয় সাংবাদিক সোহাগ হাওলাদার বলেন, 'গত মাস থেকে তথ্য অপপ্রচারকারী একটি চক্র আমাকে নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে যা ইচ্ছে লিখে দিচ্ছে। তারা কখনো আমাকে আওয়ামী দোসর বানিয়ে দিচ্ছে, আবার কখনও দালাল বানিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি আমি একাধিকবার থানা পুলিশকে জানিয়েছি। তারা লিখিত দিতে বলেছে।'
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ছাত্র সমন্বয়ক ও এনসিপির অঙ্গসংগঠন শ্রমিক উইং এর কেন্দ্রীয় সংগঠক রিফাত আহমেদ ইমন বলেন, 'ফেসবুকে আমাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকজন যেভাবে বক্তব্য দিচ্ছে এটা সত্যিই অনেক বিব্রতকর এবং এটার আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। জুলাই গণঅভুথ্যানে আমরা মাঠ পর্যায়ে কিভাবে আন্দোলনে ছিলাম, কিভাবে আমরা অংশগ্রহণ করেছি সেগুলো সবাই জানে। তবে এ ধরনের আচরণ খুব হতাশার। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
তিনি আরও বলেন, আমরা দেখেছি বেশ কিছু দিন ধরে জুলাই আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে টার্গেট করে হামলা ও অপপ্রচার লিপ্ত একটি পক্ষ। নিশ্চিত তারা দেশের ভাল চায় না। তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগকে পূর্ণবাসন সুযোগ করে দিচ্ছে।
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ছাত্র সমন্বয়ক মোঃ হৃদয় হাসান বলেন, 'আমি একজন আহত যোদ্ধা (গুলিবিদ্ধ) এবং সাভার উপজেলার বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সিনিয়র মুখ্য সংগঠক। আশুলিয়াবাসী জানে আমরা বিভিন্ন সমাজ সেবক কাজে নিয়োজিত আছি। ইতিমধ্যে বেশ কিছু কাজ ও আমরা করেছি। গত বুধবার রাতে আমাদের উপর নৃশংসভাবে হামলা করা হয়। এতে আমরা বেশ কিছুজন আহত হই। তার মধ্যে ৪জন আমরা গুরুতর আহত।'
ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহীনুর কবীর বলেন, 'যেসব হলুদ সাংবাদিক তথ্য প্রমান ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'পুলিশ, সাংবাদিক ও জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ছাত্র-জনতাকে নিয়ে যারা অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা পতিত সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কিছু করছে না। আমরাও এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছি।'
স্বদেশ প্রতিদিন/কেএইচ