প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৫, ৫:০১ পিএম

খাঁচায় বন্দী করে পাখি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন হারুন শেখ (৭২)। পাখি বিক্রিতে বিধি নিষেধ আছে সে বিষয়েও সে জানেনা। শুথু এটুকুই জানে পাখি বিক্রি করতে পারলেই সে তার স্ত্রী আর প্রতিবন্ধী কন্যার জন্য খাবার কিনতে পারবে। তাইতো প্রতিদিন কাঁধে করে পাখির খাঁচা কাঁধে বয়ে ছুটে বেড়ান বিভিন্ন জেলা উপজেলায়। হাঁটতে হয় মাইলের পর মাইল। হারুন শেখ বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ থানাধীন বাহাদুর চড়া গ্রামের মৃত মকবুল শেখের ছেলে। বর্তমানে ঢাকার কেরাণীগঞ্জে একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী আর প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে থাকেন। গতকাল মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) বিকালে হেঁটে হেঁটে পাখি বিক্রির সময় ভৈরব স্টেশন রোডে হারুণ শেখের সাথে দেখা হয় এ প্রতিনিধির। কথা হয় পাখি বিক্রির কিছু বিধি নিষেধ নিয়েও। পাখি পালন ও বিক্রি করতে বিধিনিষেধ মানতে হবে বললেন সামাজিক বনায়ন নার্সারি কর্মকর্তা ইনকিয়াদ ইবনে সাজিদ।
জানতে চাইলে হারুন শেখ জানান তার জীবনের দুঃখের কাহিনি। বড় ছেলে রায়হান (২৮) মেয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন রেহেনা (২৫) ও তার স্ত্রী জোবেদাকে নিয়েই ছিল তার সংসার। পূর্ব থেকেই ছিল তার সংসারে অভাব অনটন। অভাব গুছাতে জন্মস্থান থেকে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে ৫ বছর আগে পাড়ি জমান ঢাকার উদ্দেশ্য। কেরাণীগঞ্জের কেদারখলা এলাকায় ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া নিয়ে শুরু করেন জীবন যুদ্ধের পথচলা। ছেলে রিকশা চালান আর হারুন শেখ বাবুর্চির কাজ করেন। বাবুর্চির কাজ নিয়মিত না থাকায় মাঝে মধ্যে রিকশা চালানোসহ বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকের কাজও করতেন। বয়স বেড়ে যাওয়ায় ঐ সকল কাজ আর করতে পারছিলেন না। এরই মধ্যে ছেলে তার নিজ পছন্দেই বিয়ে করে মাস খানেক যেতেই তার বউকে নিয়ে বাবা মাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। ছেলে চলে যাওয়ায় সংসারে অভাব আরো বেড়ে যায়। হারুন শেখের একার রুজিতে আর চলছিল না। তার স্ত্রীও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। মেয়েও প্রতিবন্ধী। ঠিকমতো সংসারের খাবার যোগাতেই পারছিলেন না। তার একটাই কথা অসুখ আল্লাহই দিছে ভালাইও আল্লাহই করবেন। এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে একদিন একটি পাখির দোকান মালিকের সাথে তার পরিচয় হয়। সেই থেকেই শুরু হয় হারুন শেখের পাখি বিক্রির জীবন। দোকান মালিকের পরামর্শে দুটি খাচাতে করে বিভিন্ন জাতের কয়েকটি পাখি নিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে কিছু পাখি বিক্রি করেন। এতে বেশ কিছু টাকা তার লাভ হয়। প্রতিদিন পাখি বিক্রি করে দৈনিক ৫ থেকে ৭ শত টাকা রোজি করে থাকেন।
বর্তমানে টিয়া, মুনিয়া, বাজিগর, শালিকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ঢাকা থেকে ক্রয় করে ফেরি করে বিক্রি করেন। একেকটি টিয়ার দাম হাঁকা হয় ১ হাজার থেকে ১২শত টাকা। শালিকের দাম ৪ থেকে ৫ শত টাকা। বর্তমানে কোন দিন ২ থেকে ৪ টা পাখি বিক্রি করতে পারলেও কোন দিন একেবারেই হয় না। পাখি বিক্রি না হওয়ায় সারাদিন ঘুরে ঘুরে এক সময় উপোস থেকেই বাড়িতে পৌঁছেন হারুন শেখ। স্ত্রী আর কন্যা হয় তো অপেক্ষায় থাকে ঘরের কর্তা ব্যক্তিটি হয় তো আজ কিছু টাকা পয়সা রোজি করে নিয়ে আসবে। আসার পর হয় তো কিছু একটা রান্নাবান্না করে দু-মুঠো খেতে পারবে। এমন আশাও অনেক সময় স্বপ্নের মত হয়ে যায়। যখন দেখে কর্তা ব্যক্তিটি ঘরে ফিরেছে শুকনো মুখে তখন তাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না আজকে হয় তো কোনো রুজি রোজগার হয়নি। যে বাসায় থাকেন সে বাসার ভাড়া প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা। খরচ আছে প্রতিমাসে কম করে হলেও ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু হারুন শেখ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার উপর রোজি করতে না পারায় পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হারুন শেখকে হিমশিম খেতে হয় প্রতি মাসেই।
মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও টাকার অভাব আর প্রতিবন্ধী হওয়ায় বিয়েও দিতে পারছেন না। এসব কথা বলতে বলতে এক সময় হারুন শেখ কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, কেমন জীবন নিয়ে দুনিয়াতে আসলাম! আমার পরিবারের কেউ মারা গেলে যে দাফন কাঁপন করবে সে ব্যবস্থাও নেই। আমরা কেউ মারা গেলে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য তুলে আমাদের কবরস্থ করা হবে। আমার ছেলে যে কোথায় থাকে আমি নিজেও জানি না। আমাদের কথা হয়তো ভুলেই গেছে।
পাখি বিক্রি করতে কিছু বিধি নিষেধ আছে জানতে চাইলে হারুন শেখ বলেন, বিধিনিষেধ আছে কিনা তা জানি না। পেটের ভাত যোগাইতেই পাখি বিক্রি করছি। আমার শরীরের যে অবস্থা বাড়ি ফিরে বউ বাচ্চার সাথে আর দেখা হয়কি না এইডাও কইতাম পারতাছি না।
সামাজিক বনায়ন নার্সারি কর্মকর্তা ইনকিয়াদ ইবনে সাজিদ বলেন, বন বিভাগের এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৮৮ প্রজাতির দেশীয় পাখি রয়েছে। এছাড়াও প্রায় ২৪০ প্রজাতির অতিথি পাখি প্রতিবছর বাংলাদেশে আসে। কিন্তু বনভূমি উজাড়, জলাশয় ভরাট, নির্বিচারে পাখি শিকার এবং পরিবেশ দূষণের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় নানা জাতের পাখি যেমন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তেমনি অতিথি পাখিদের আগমনও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। অথচ দেশীয় এবং অতিথি পাখি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বন্যপ্রাণী ও অতিথি পাখি সংরক্ষণের জন্য অনেক আগে থেকেই আইন রয়েছে। আমাদের দেশে পাখি বিক্রি ও পালনে ব্যাপক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দেশীয় পাখি যেমন ময়না, টিয়া, শালিকসহ বিভিন্ন পাখি পালন ও বিক্রি করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে কবুতর ও কোয়েল পাখি পালন করা যায়। এছাড়াও বিদেশি কিছু পাখি রয়েছে যেমন বাজিগর ও লাভবার্ড পালন ও বিক্রি করা যায়। এসব পাখি বাইরে গেলে ক্ষতি হয় বলে সেগুলো পালন করা যায়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর