
# সততা স্টোর ও বাইরের দোকানের পণ্যর দাম সমান
# দোকানটির সরকারি ফান্ড নেই
# বিক্রেতাহীন দোকান
# ক্রেতারা পণ্য নিতে নানা সমস্যায় পড়েন
# ক্রেতাদের পণ্য নিতে মূল্যে পরিশোধ ‘পান্স কার্ড’ সিস্টেম দাবি
দোকানের নাম ‘সততা স্টোর’। এটি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালু রয়েছে। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটাই-তা হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষার্থীদের সততার প্রতি চর্চা শেখানো। তবে, দুদক যে উদ্দেশ্য ‘সততা স্টোর’ চালু করেছে। সেটির কোন কাজে আসছে না। বরং, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নামেই দোকান ‘সততা স্টোর’। যার বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সততার চর্চা দোকান থেকে নয়-মূলত এর কার্যক্রম কাগজে-কলমে দাড়িয়েছে। তবে, দুদকের ওই মহত উদ্যোগ (সততা স্টোর) শুরুতে সাড়া ফেলেছিল।
রাজধানীর সেগুনবাগিচার আইডিয়াল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দোকান ‘সততা স্টোর’ রয়েছে। এর কার্যক্রম (বাস্তব) জানতে স্কুলটির কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে সরেজমিনে কথা হয়। একপর্যায়ে তারা জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে দুদকের ‘সততা স্টোর’ থাকলেও-সেটির প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ খুবই কম। তারা দোকান ‘সততা স্টোর’ থেকে কোন পণ্য কিনতে চায় না। কারণ, ‘সততা স্টোর’ আর বাইরের দোকানের পণ্যের দাম সমান। এ কারণে শিক্ষার্থীরা বাইরের দোকান থেকেই বেশি কেনে। এছাড়া, দাম সমান হওয়ায় (বাইরের দোকান) তাদের অভিভাবকরাও বাইরের দোকানগুলো থেকে পণ্য কিনে দেন।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের পর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালু হয় দুদকের ‘সততা স্টোর’। এই দোকানে প্রয়োজনীয় পণ্য থরে থরে সাজানো থাকে। তবে, দোকানদার অর্থাত কোনো বিক্রেতা নেই। ক্রেতারা (শিক্ষার্থী) যখন ওই দোকান থেকে পণ্য কিনেন তখন পণ্যের গায়ে দাম হিসাব করে নির্ধারিত বাক্সে টাকা রাখেন। তবে, এই ব্যবস্থায় যতো ঝামেলা।
এনিয়ে আইডিয়াল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বলেন, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা খুবই ছোট। তারা অনেক কিছু বুঝতে পারে না। দুদকের উদ্যোগে আমাদের প্রতিষ্ঠানে যে দোকান (সততা স্টোর) রয়েছে। সেটি খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে, দোকানের বিক্রেতা নেই। সরকারি কোন ফান্ডের ব্যবস্থা নেই। পণ্য কিনে টাকা খুচরা করা যায় না। বাইরের দোকান আর সততা স্টোরের পণ্যের দাম একই। দোকানদার না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত বক্সে টাকা না রেখেই পণ্য নিয়ে আসে। তারা জানান, এসব কারণে ‘সততা স্টোর’ সেবা বলতে বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
দুদক অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মোট ৬ হাজার ৭৭৬টি দোকান ‘সততা স্টোর’ রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে; ১ হাজার ৬৬টি, চট্রগ্রাম বিভাগে; ১ হাজার ৮৬টি, রাজশাহী বিভাগে; ৮৪৫টি, খুলনা বিভাগে; ১ হাজার ৮২৬টি, বরিশাল বিভাগে; ৪৮০টি, সিলেট বিভাগে ২৪২টি, রংপুর বিভাগে; ৭৩৭টি, ময়মনসিংহ বিভাগে; ১৯৭টি।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, দেশের ৬৪ জেলায় একটি বালক ও একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ‘সততা স্টোর’ রয়েছে। এই দোকানে খাতা, কলম, পেনসিল, ইরেজার, স্কেল, জ্যামিতি বক্স, রং পেনসিলসহ শিক্ষাসামগ্রী এবং চিপস, বিস্কুটসহ খাবার জিনিস সাজানো থাকে। তবে, দোকান পরিচালনা কমিটি চাইলে অন্যান্য পণ্যও রাখেন। আর এসব পণ্যর দাম বাজারমূল্যের সমান ধরা হয়েছে।
জানতে চাইলে আইডিয়াল মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরিফুজ্জামান স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সততা স্টোর মানে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। যেমন, খাতা পেনসিল, রাবার, টিফিনের জন্য সিঙ্গারা কেক,সামুচা ও অন্যান্য পণ্যÑএসব দোকানে সাজানো থাকবে। তিনি বলেন, ওইসব পণ্য থেকে শিক্ষার্থীদের যার যেটা প্রয়োজন। পণ্যর সমপরিমাণ মূল্য বক্সে রেখে নিয়ে আসবে।
আরিফুজ্জামান জানান, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার পর থেকেই দোকান ‘সততা স্টোর’ দেখছেন। তবে, আগের তুলনায় এখন এই দোকান দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, সরকারি অনুদান নেই, দোকান পরিচালনার মতো ফান্ড নেই এবং দোকানের বিক্রেতাও নেই। আর এসব কারণে দোকনটির সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে আরিফুজ্জামান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই গরিব ঘরের। এখানে ধনীদের ছেলে-মেয়েকে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, কারো কারো কাছে টাকা থাকে না। তারপরেও পণ্য নিয়ে আসে। একারণে সমস্যা হয়। তবে, নির্ধারিত বক্সে টাকা রেখে আসে না।
অপর প্রশ্নের জবাবে আরিফুজ্জামান বলেন, সততা স্টোরে সরকারি ফান্ড নেই। সরকার টাকা দেন না। এ কারণে পরিচালনা কমিটিরও মনোবল যতেষ্ঠ নয়। তারা দোকান পরিচালনার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়েছেন। এখন সততা স্টোর বলতে গেলে দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, সততা স্টোরে ক্রেতাদের পণ্য নিতে মূল্যে পরিশোধ পান্স কার্ড সিস্টেম চালু করে দিলে সমস্যার সমাধান হতো।
দুদকের ‘সততা স্টোর’ রয়েছে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, সরকারি জামিলা আইনুল আনন্দ বিদ্যালয় ও কলেজ,পিসি কালচার হাউজিং পাবলিক স্কুল সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। রাজধানীর এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্য আরো কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নেওয়া হয়। তবে, ওইসকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রতিষ্ঠানে দুদকের দোকান সততা স্টোর-এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে গেছে। তারা বলেন, নানা কারণেই সততা স্টোর থেকে পণ্য কিনতে ক্রেতারা আগ্রহ হারিয়েছেন। বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দোকান ‘সততা স্টোর’ রয়েছে। তবে, ওই এলাকার স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুরুতে সততা স্টোর বেশ জমে উঠেছিল। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে এখন প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওই দোকানের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলেন, দোকারের বিক্রেতা নেই, পণ্য ময়লা পড়ে থাকে, পণ্য নেওয়ার পর ভাংতির ব্যবস্থা নেই, পণ্যর দাম বাইরের দোকানের সমমান। এসব কারণ ছাড়া আরো কিছু কারণে ক্রেতারা আর ‘সততা স্টোর’ থেকে পণ্য নিচ্ছে না।
দুদক সূত্র জানায়, কমিশন দুর্নীতি দমনের চেয়ে প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আগামী প্রজন্মের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা, দুর্নীতিকে ঘৃণা করার মানসিকতা ও সততার চর্চা তৈরির মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে চায় দুদক।
সততা স্টোর গঠন ও পরিচালনা বিষয়ে তৈরি নীতিমালা: বিক্রেতাবিহীন ওই দোকান স্কুল ক্যাম্পাসের উপযুক্ত কোনো কক্ষে স্থাপন করা হবে। দোকানের পুঁজির ব্যবস্থা করবে পরিচালনা পর্ষদ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে দোকানের জন্য প্রাথমিক পুঁজি সংগ্রহ করে বিনিয়োগ করবে। ওই দোকান থেকে জিনিসপত্র কেনার বিষয়েও নীতিমালা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, দোকানে ঢোকার সময় রেজিস্ট্রার খাতায় শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি ও রোল নম্বর লিখতে হবে। পরে পণ্যের মূল্যতালিকা দেখে কেনা পণ্যের দাম দোকানে রাখা ক্যালকুলেটরে হিসাব করে পরিশোধ করতে হবে। ক্রেতাকে একটি কাগজে পণ্যের নাম ও টাকার পরিমাণ লিখে টেবিলে রাখা খামে ভরে নির্ধারিত ক্যাশবাক্সে ফেলতে হবে।
চাহিদামতো পণ্য না পাওয়া গেলে সেখানে রাখা আরেকটি রেজিস্ট্রারে লিখে অগ্রিম ফরমাশ দেওয়া যাবে। নীতিমালা অনুযায়ী স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সমন্বয়ে তিন সদস্যের বিশেষ মনিটরিং কমিটি সততা স্টোরের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তদারক করবে। ওই কমিটি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করে হিসাব যাচাই ও ক্রয়যোগ্য সামগ্রীর তালিকা করে প্রয়োজনীয় অর্থ স্টোর পরিচালনা কমিটির কাছে দেবে। কমিটিকে এক দিন পর পর স্টোর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কমিটি পণ্যের চাহিদা নির্ধারণ, নিয়মিত পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা, পণ্যের গায়ে মূল্য লেবেল লাগানোর কাজ করবে। আর পণ্যের মূল্যতালিকা স্টোরের দৃশ্যমান স্থানে টাঙানো থাকবে।
এবিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সততা স্টোরের উদ্যোগটা হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততার চর্চা শেখানো। আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে সততা ও নৈতিকতার শিক্ষাটা গড়ে তোলার জন্য। সততা স্টোরে কিছু ক্ষেত্রে দুদক থেকে অর্থায়ন করা হয়। আবার কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে সততা স্টোর করা হয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর