
সংগৃহীত ছবি
‘অগ্রহায়নের আট, যেখানে মন সেখানে ধান কাট’ অর্থাৎ অগ্রহায়নের ৮ তারিখ থেকে আমন ধান কাটা যাবে-দীর্ঘদিন ধরে এমন প্রবাদ রয়েছে পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলোতে। কিন্তু সেদিন বদলেছে। এখন কার্তিকের শুরুতেই মাঠে পাঁকছে আগাম জাতের আমন ধান।
এখন চা পাথর সমৃদ্ধ জেলা পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে আর আশ্বিন-কার্তিক মাস অভাবের মাস থাকে না। আমন ধান রোপনের পর থেকে অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত কৃষি শ্রমিকদের হাতে কোন কাজ থাকত না। এই সময়টাতে অনেকে কাজের সন্ধানে চলে যেত ভিন্ন জেলায়।
এখন আর পঞ্চগড়সহ এই এলাকার লোকজনদের কাজের সন্ধানে খুব বেশি একটা জেলার বাইরে যেতে হয়না। আগাম জাতের ধান চাষ এবং সেই জমিতে আগাম শীতকালীন শাক সবজি আবাদ করার কারণে কৃষি শ্রমিকদের কাজ লেগেই থাকে।
অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকার জমিতে লাগানো ধান কেটে বাড়িতে আনায় কৃষকের ঘর নতুন ধানের গন্ধে মৌ মৌ করছে। চলছে পিঠা-পুলির আয়োজনও। আর এখনও যাদের ধান পাকেনি তারা তাদের কাছ থেকে ধান ধার করে নিয়ে দিন পার করছেন। আর ধান কেটে এনে বাড়িতে মাড়াইয়ের পর কাঁচা খড়ের চাহিদাও এখন তুঙ্গে। গো-খাদ্যের তীব্র সংকট থাকায় অনেকে এই কাঁচা খড় অধিক দামে বিক্রয় করে অধিক লাভ করতে পারছে কৃষকরা।
কৃষকরা জানান, আদিকাল ধরেই আমরা সম্পূর্ণ প্রকৃতি নির্ভর আমন ধান চাষ করে আসছি। আগে অগ্রহায়ন মাসের শুরু থেকে আমন ধান কাটা শুরু হলেও এখন তার থেকে এক-দেড় মাস আগেই কৃষকরা ঘরে তুলতে পারছেন আমন ধান। বর্ষা মৌসূমের শেষ দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে উত্তরের জেলাগুলোতে।
আগামে জাতের ব্রি ধান-৩৩, ৫৬, ৬২, ৭২, বিনা-৭ ধান, ভারতীয় জাতের গুটি পারি, স্বর্ণা পারিসহ বিভিন্ন ধান ইতোমধ্যে পাকা শুরু করেছে। পুরনো জাতের আমন ধান আবাদ করে যেখানে কৃষকরা প্রতি বিঘায় ৮-১০ মন ধান পেত; আগাম জাতের ধান আবাদ করে তারা ১৫-২০ মন পর্যন্ত ধান পাচ্ছেন। শুরুতে ধানের দাম কিছুটা কম হলেও কাঁচা খড় বিক্রয় করে অধিক টাকা আয় করতে পারছেন কৃষকরা।
এক বিঘা জমির ধান কেটে মাড়াইয়ের পর কাচা খড় হিসেবে ধানের আটি বাজারে বিক্রয় হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হচ্ছে। অনেকে আবার ধান কাটার পর দ্রুত জমিতে চাষ দিয়ে মাটি শুকিয়ে নিচ্ছেন। কিছু দিনের মধ্যে ধানের জমিতে আগাম জাতের আলু, সরিষাসহ শীতকালীন বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করবেন কৃষকরা।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের কিসমত রসেয়া গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম জানান, এবার তিনি ২ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। ইতিমধ্যে সব ধান পেকে গেছে। ধানের চেহারা খুব ভাল। প্রতি বিঘায় ১৯-২০ মন ফলন আসতে পারে।
আগামী দুই/দিনের মধ্যে ধান কাটবেন তিনি। তিনি আরও জানান, বর্ষার শেষ থেকে ধান ক্ষেতে পোকামাকড়ের আক্রমনে দিশেহারা হয়েছিলেন তিনি। অনেক টাকার ওষুধ জমিতে স্প্রে করতে হয়েছে। আগের থেকে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
পাশের ময়দানদিঘী বাজারে নতুন প্রতি মন ধান এক হাজার একশ থেকে এক হাজার দুইশ টাকায় বিক্রয় হচ্ছে। প্রতি মন ধান এক হাজার পাঁচশ টাকা হলে আমরা কৃষকরা লাভবান হতে পারতাম। আমি দুই বিঘা জমির ধান কেটে ওই জমি চাষ করে আলু লাগাবো। কিছু জমিতে বিভিন্ন শাক সবজি চাষ করব। বাড়ির খাওয়ার পর অবশিষ্ট শাক সবজি ময়দানদিঘী বাজারে নিয়ে বিক্রয় করতে পারব।
পঞ্চগড়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক আব্দুল মতিন বলেন, চলতি আমন মৌসূমে পঞ্চগড় জেলায় এক লাখ ৪৪ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ জেলায় এক লাখ ৪৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। এবার আবহাওয়া ভাল থাকায় আমরা বাম্পার ফলনের আশা করছি। আমাদের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তিন লাখ ৬১ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন।
তবে আমাদের আশা এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরও বেশি ধান উৎপাদিত হবে। তিনি আরও জানান, নতুন কাঁচা ধান বাজারে উঠায় এখনও দাম বেশ কম। আমরা আশা করছি পুরো মৌসূম শুরু হলে এবং মিলাররা ধান কেনা শুরু করলে ধানের দাম আরও বেড়ে যাবে। এছাড়া আগাম ধান কাটার পর সেই জমিতে আলু, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন শাক সবজি আবাদ করে অতিরিক্ত আয় করতে পারবেন।