
একসময় এদেশের মানুষের ঘরে ঘরে শোভা পেত মাটির তৈরি থালা, বাটি, কলস ও গ্লাসসহ নানান তৈজসপত্র। সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক ও মেলামাইনের পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে। এতে কমেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের কদর। হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।
তবে এ শিল্পের সঙ্গে মানুষকে নতুন করে পরিচিত করতে জামালপুর শিল্প ও পণ্য মেলায় এক কোণে মাটির তৈরি পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, আধুনিক পণ্যের ভিড়েও মানুষ নিজেদের ঐতিহ্যকে ভুলে যাবে না।
মাটির তৈরি নানান পণ্য নিয়ে মেলায় স্টল দিয়েছেন ব্যবসায়ী মোজাম্মেল। মেলার শুরুতে দর্শনার্থীর উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে বলে জানান তিনি। তাঁর আশা, আধুনিক পণ্যের ব্যবহার বাড়লেও মানুষ নিজেদের ঐতিহ্যকে ভালোবেসে মৃৎশিল্পের পাশে দাঁড়াবে।
মোজাম্মেল বলেন, ‘মেলার শুরুতে মানুষজন একটু কম এলেও ধীরে ধীরে দর্শনার্থী বাড়ছে। মানুষ এখনো নিজেদের ঐতিহ্যকে ধারণ করে ও ভালোবাসে। মাটির তৈরি এসব পণ্যের বিষয়ে অনেকেই জানেন না। মানুষকে এ শিল্পের সঙ্গে পরিচিত করতেই আমরা এখানে স্টল দিয়েছি।’
একই দোকানে মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন আরেক ব্যবসায়ী রিয়াদ। তাঁর মতে, প্লাস্টিক ও মেলামাইনের ব্যাপক ব্যবহারে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা কমেছে। একসময় দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় এসব পণ্য এখন অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ব্যবহার থেকে। তারপরও ঐতিহ্য ধরে রাখার তাগিদ থেকেই মেলায় দোকান দিয়েছেন তাঁরা।
রিয়াদ বলেন, ‘প্লাস্টিক-মেলামাইনের যুগে মাটির জিনিসের ব্যবহার কমে গেছে। মাটির পাত্রে খাওয়া-দাওয়া করলে নানা সমস্যা থেকে উপকার পাওয়া যায়। কিন্তু এখন আর কেউ এসব মনে রাখে না। আমরা চাই, আমাদের ঐতিহ্য টিকে থাকুক। তাই মেলায় স্টল দিয়েছি।’
মেলায় মৃৎশিল্পের দোকান দেখতে এসে পছন্দের কিছু পণ্য কিনেছেন বিজয় রহমান। তাঁর কাছে মাটির তৈরি এসব তৈজসপত্র শুধু ব্যবহার্য সামগ্রী নয়, বরং পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। ছোটবেলায় দাদা-দাদির কাছে মাটির পাত্রের বিভিন্ন উপকারিতার কথা শুনলেও বর্তমানে এসব পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
বিজয় রহমান বলেন, ‘আমরা মৃৎশিল্পকে প্রায় ভুলতে বসেছি। আগে দাদা-দাদির কাছে মাটির তৈরি জিনিসের কথা শুনতাম, কিন্তু এখন সচরাচর চোখে পড়ে না। তাঁরা বলতেন, মাটির পাত্রে খাওয়া-দাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। আজ মেলায় দোকানটি দেখে লোভ সামলাতে পারিনি। ঘুরে দেখেছি, পছন্দের কিছু জিনিসও কিনেছি।’
মেলায় ঘুরতে আসা আহসান জুবায়ের মনে করেন, সময়ের পরিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন উদ্যোগ ও মানুষের সচেতনতা। পাশাপাশি মাটির তৈরি পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আহসান জুবায়ের বলেন, ‘প্লাস্টিক ও মেলামাইনের যুগে আমাদের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই না, এই ঐতিহ্য পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাক। মাটির তৈরি পণ্যকে টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
মেলা কমিটির সদস্য নাসিম মিয়া বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি, জামালপুরের মানুষকে নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে দিতে। মৃৎশিল্প আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। আমরা চাই, মেলার মাধ্যমে হারানো ঐতিহ্যগুলো মানুষের মধ্যে আবার ফিরে আসুক।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ