
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি নিরাপদ অভিবাসন, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার বিকেলে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (আরএমএমআরইউ) ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ‘সোনার মানুষ সম্মিলন-২০২৬’ উপলক্ষে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে অভিবাসন হবে নিরাপদ, কর্মসংস্থান হবে মর্যাদাপূর্ণ, দক্ষ জনশক্তি বিশ্ববাজারে দেশের অবস্থানকে করবে শক্তিশালী এবং প্রবাসী ও প্রত্যাগত কর্মীরা হবেন জাতীয় উন্নয়নের সমান অংশীদার।’
অনুষ্ঠানে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
এ সময় রাষ্ট্রপতি সরকার ও বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে অভিবাসীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলারের পেছনে রয়েছে একজন মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও স্বপ্ন। তাঁদের অধিকার রক্ষা, মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের অর্জনকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। তাঁদের কারণে দেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে। সুতরাং তাঁদের প্রতি দায়িত্ব অনেক বেশি।
প্রবাসীদের কর্মক্ষম ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁদের খুব বেশি প্রস্তুত ও সক্ষম করে তোলা যায় না। ফলে বেশির ভাগই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যান। কখনো কখনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই তাঁরা বিদেশে যান। আবার দেখা যায়, যে কাজের জন্য তাঁদের নেওয়া হয়, সেই কাজও তাঁরা করতে পারেন না। ফলে তাঁদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যে তিনি দেখেছেন, প্রবাসীরা অত্যন্ত কষ্ট করে জীবনযাপন করেন এবং তাঁদের উপার্জনের প্রায় সবটাই দেশে পাঠান। এ কারণে দেশে তাঁদের সবচেয়ে বেশি সম্মান দেওয়া উচিত। তাঁরাই দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স রাষ্ট্র পরিচালনা, দেশে কলকারখানা গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল দুটি খাতের একটি তৈরি পোশাকশিল্প (আরএমজি), অন্যটি রেমিট্যান্স।
অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একবার মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষে তাঁকে ডেকে বলেছিলেন, সৌদি আরব তাদের পৌরসভার জন্য ১০ হাজার শ্রমিক নেবে। শর্ত ছিল, শ্রমিকদের শুধু পাসপোর্ট তৈরি করতে হবে। বাকি টিকিট ও যাবতীয় খরচ সৌদি আরব বহন করবে।
বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের অবস্থা ঠিক উল্টো। বিদেশে যেতে একজন কর্মীকে নিজের খরচের পাশাপাশি তাঁকে নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের খরচও বহন করতে হয়। সব মিলিয়ে তাঁকে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
প্রবাসীদের এ ধরনের ভোগান্তির জন্য বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও এজেন্সির অনেকাংশে দায় রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও প্রবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি উপজেলা পর্যায়ে ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার চালু এবং প্রবাসী কার্ডের মতো উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।
এ সময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁদের ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রপতি।
তিনি প্রস্তাবিত ‘অভিবাসন দশক’ বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে অভিবাসীদের অধিকতর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলন ভবিষ্যতে অভিবাসনকে আরও নিরাপদ ও পরিকল্পিত করতে ভূমিকা রাখবে।
এর আগে রাষ্ট্রপতি সাতটি ক্যাটাগরিতে ‘সোনার মানুষ’ সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট হস্তান্তর করেন।
অনুষ্ঠানে আরএমএমআরইউর নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনীম সিদ্দিকী নীতিনির্ধারণী বিষয় ও পরবর্তী বছরের পরিকল্পনা সম্পর্কে বক্তব্য দেন। সংগঠনটির উপনির্বাহী পরিচালক মোতাসিম বিল্লাহ স্বাগত বক্তব্য দেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ