প্রকাশ: রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:২১ পিএম

“আমার ছেলের সাথে একটু যোগাযোগ করাইয়া দেও, তোমাগো হাত-পা ধইরা কই, যোগাযোগ করাইয়া দেও। আমার একটা সন্তান, ও ছোট থাকা সময়ে স্বামী হারাইছি, আমার কেউ নেই এই ছেলে ছাড়া। আমাকে যে ‘মা’ কইয়া ডাকবে, এমন কেউ নেই। মোর মানিকেরে আইনে দেও মোর কোলে! ওরে হানিফা! তোর মায়রে কেউ মা কয় না, তুই কী কইয়া গেলি, আমি তোরে কেমনে ভুইলা থাকমু”
রবিবার (১১ অক্টবর) সকালে নিজ বাড়িতে কান্নায় বুক ভেঙে যাওয়া বিলাপ করতে করতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন মা ছাহেরা বেগম। সৌদি আরবে একমাত্র সন্তান হানিফাকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি আর বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকা।
হানিফ (৩৬), একই এলাকার প্রয়াত জালাল মিয়ার ছেলে। তিনি ১১ বছর বয়সী ছেলে মো. জেনায়েদ ও ৫ বছর বয়সী মেয়ে মোসা. ছামিরার পিতা। শৈশবে মাত্র দুই বছর বয়সেই হানিফ তার পিতাকে হারান; সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হন।
পরিবার জানায়, আড়াই বছর আগে আগে ধারদেনা করে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান হানিফা (৩৬)। ভিসা জটিলতায় ২ বছর ধরে অবৈধভাবে একটি পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। পরবর্তীতে পাঁচ মাস আগে ভিসা বৈধ করার আশায় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন দালালদের। কিন্তু গত ৩ অক্টোবর প্রবাসের মাটিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন হানিফা। ওই দিনই পরিবার জানতে পারে তার মৃত্যুর খবর। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো জানতে পারেনি পরিবার। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ও অর্থসংকটে হানিফার লাশ দেশে ফেরানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একমাত্র কর্মক্ষম মানুষকে হারিয়ে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে পরিবারটি। এখন লাশ ফিরিয়ে আনা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় দিন পার করছে। নিহতের পরিবার ও স্বজনরা দ্রুত সরকারি সহায়তায় হানিফার মরদেহ নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
নিহতের স্ত্রী কাজল আক্তার কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামী বিদেশ যাওয়ার সময় ধারদেনা করে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। পরে আবার ভিসা বৈধ করার আশায় আবারও ৬টি এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেই। এখন দুটি অবুঝ সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর মতো কোনো অবস্থাই আমার নেই। উল্টো মাথার ওপর ঋণের পাহাড়। এখন আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে, ওরা কার মুখের দিকে তাকাবে? সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমার স্বামীর লাশটা দেশে এনে দাফন করার ব্যবস্থা করে দিন, যেন আমার ছেলে-মেয়ে তাদের বাবার কবরটা দেখতে পারে। আমি সরকারের কাছে আর কিছু চাই না।’
তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতীশ সরকার বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির পক্ষ হয়ে পরিবারের মাধ্যমে দূতাবাসে যোগাযোগ করলে লাশ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। উপজেলা প্রশাসন এই প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ