
কিশোরগঞ্জ পৌর শহরে যানজট নিরসনের জন্য পৌরসভা কর্তৃক ২০১৬ সালে ইজিবাইকে মনোগ্রাম প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে মেয়র মো. পারভেজ মিয়ার নিজ উদ্যোগে পৌরসভার আনসার ও ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে শহরের যানজট নিরসনে প্রচেষ্টা চালানো হয়। ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় পুলিশের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও যানজট নিরসন করা সম্ভব হয়নি। এই উদ্যোগ শিথিল হওয়ায় শহরে যানজট আগের রূপ ধারণ করে। ফলে কিশোরগঞ্জ শহরে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে, যার দরুন জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। আটকা পড়ে রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, সঠিক সময়ে কাজে যোগ দেওয়া ইত্যাদি সমস্যা নিত্যদিনের সঙ্গী।
এসব বিষয় চিন্তা করে কয়েকজন ইজিবাইক মালিক একত্রিত হয়ে এসব সমস্যা দূর করার জন্য প্রায় ২ বছর যাবত আন্দোলন করেন। আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ২০১৯ সালের প্রথম দিকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে যানজট নিরসনের জন্য একটি উপকমিটি গঠন করা হয় এবং তাতে সদস্য হিসেবে সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকজন অংশগ্রহণ করেন। ইজিবাইক মালিক সমিতির পক্ষে ও পুলিশ প্রশাসনকে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালের প্রথম দিকে কার্যক্রমটি পরিচালনার জন্য একটি মৌখিক সংগঠন তৈরি করা হয়। তার নামকরণ করা হয় কিশোরগঞ্জ পৌর ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক মালিক সমিতি।
কার্যক্রমের প্রথম ধাপ হিসেবে সকল ইজিবাইক মালিকদের নিয়ে কিশোরগঞ্জ অতিথি কমিউনিটি সেন্টারে তৎকালীন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পৌর মেয়রসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও পৌর মেয়রের উপস্থিতিতে কিশোরগঞ্জ শহরের বটতলা মোড়ে স্টিকার লাগিয়ে উদ্বোধন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, স্টিকারসম্বলিত গাড়িগুলো পৌরসভার ভেতরে চলাচল করবে। ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় উক্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
শহরে আবারও আগের মতো যানজট দেখা দিলে আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে আলোচনান্তে ট্রাফিক পুলিশের সহযোগী হিসেবে সমিতির লোকজনকে সহযোগিতা করতে বলা হলে সমিতির পক্ষ থেকে ২৪ জন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ডিউটিরত ব্যক্তিদের পরিচিতির জন্য তাঁদের গায়ে হলুদ রঙের গেঞ্জি প্রদান করা হয় এবং তাতে সংগঠনের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু ১৬/০২/২০১৯ ইং তারিখ থেকে ২৪ জন স্বেচ্ছাসেবক একটানা ৪ মাস বিনা বেতনে শহরে যানজট নিরসনে অনবরত কাজ করে যান। কিন্তু বিনা বেতনে কাজ করায় তাঁদের সংসারে অভাব-অনটন দেখা দিলে তাঁরা কাজ করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হলে সিদ্ধান্ত হয় যে, যেহেতু বিনা বেতনে কাজ করা যায় না, সেহেতু হলুদ গেঞ্জি পরিহিত ব্যক্তিদের বেতন ইজিবাইক মনোগ্রামের মালিকরা বহন করবেন। মনোগ্রামের মালিকদের নিয়ে আলোচনা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেহেতু আইনের একটি বিষয় থাকে, সেহেতু বিগত ০৮ মে ২০১৯ ইং তারিখে সমবায় থেকে কিশোরগঞ্জ পৌর ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক মালিক সমবায় সমিতি গঠন করা হয়, যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ১১৯।
পৌর এলাকায় যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি সমিতি কর্তৃক নিয়োজিত হলুদ গেঞ্জি পরিহিত স্বেচ্ছাসেবকেরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০-২১ অর্থবছরে পৌরসভা কর্তৃক ৬০০ মনোগ্রাম নবায়ন করা হয়। বিগত ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতন হলে পুলিশ এবং ট্রাফিকের কোনো কার্যক্রম না থাকায় শহরে যানজট নিরসনে ছাত্রদের পাশাপাশি সমিতির স্বেচ্ছাসেবকেরা নিরলস ভূমিকা পালন করেন এবং এখন পর্যন্ত যানজট নিরসনে সমিতির স্বেচ্ছাসেবকেরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন।
সমিতি কর্তৃক অভিযোগ, পৌরসভা কর্তৃক পুরাতন মনোগ্রাম নবায়ন করে গত ২৭ সেপ্টেম্বর নতুন করে ইজিবাইকের মনোগ্রাম দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সমিতি কর্তৃপক্ষ আরও অভিযোগ করেন যে, বিগত ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ ও গত ০৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ মনোগ্রাম নবায়নের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের নিকট দরখাস্ত দিলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে ইজিবাইক মালিক সমিতির সন্দেহ হচ্ছে যে, পুরাতন মনোগ্রাম বাতিল করার পাঁয়তারা চলছে। এরই প্রেক্ষিতে ইজিবাইক মালিক সমিতি পৌর কর্তৃপক্ষকে একটি স্মারকলিপি প্রদান করে। পরবর্তীতে আবার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। অদ্যাবধি পর্যন্ত পৌর কর্তৃপক্ষ মনোগ্রাম নবায়নের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
এরই প্রেক্ষিতে রোববার (১১ অক্টোবর) কিশোরগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী কিশোরগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে যোগদান করবেন—এমন সংবাদে পৌরসভা ইজিবাইক মালিক সমিতির সকল সদস্যসহ নেতৃবৃন্দ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইজিবাইক মনোগ্রাম নবায়নের কথা বলেন। তখন তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, এ ব্যাপারে আগামী মিটিংয়ে একটি সুষ্ঠু ফয়সালা করবেন।
এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, মনোগ্রামসম্বলিত অটোগাড়ি চলাচল করবে। এটা বন্ধ করা যাবে না। এর সঙ্গে ৬০০ পরিবারের রুটি-রুজি জড়িত।
কিশোরগঞ্জ জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সুমন বলেন, ৬০০ পরিবারের কথা চিন্তা করে মনোগ্রাম নবায়ন করা উচিত। এতে পৌর কর্তৃপক্ষের দ্বিমত করা উচিত নয়।
কিশোরগঞ্জ পৌর ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক মালিক সমবায় সমিতির উপদেষ্টা ও কিশোরগঞ্জ পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মো. আমিনুল ইসলাম আশফাক বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষ যদি মনোগ্রাম নবায়ন না দেন, তবে এই পরিবারগুলোর সঙ্গে বেঈমানি করা হবে। কারণ, ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর পৌরসভায় যানজট নিরসনে ছাত্রদের পাশাপাশি সমিতির স্বেচ্ছাসেবকেরা নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। এখনও তাঁরা ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে যানজট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছেন। পৌর কর্তৃপক্ষ শহরে যানজট নিরসনে কোনো ভূমিকা পালন করেনি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের একটি টাকাও প্রদান করে না।
কিশোরগঞ্জ পৌর ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক মালিক সমবায় সমিতির আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন বলেন, ২০১৬ সালে মনোগ্রাম দেওয়ার পর আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ২০১৯ সালে সমিতি গঠন করে শহরে যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিগত করোনার সময়ও মানুষ যখন ঘরবাড়ি থেকে বের হতে পারেনি, তখনও সমিতির স্বেচ্ছাসেবকেরা করোনার তোয়াক্কা না করে কাজ করে গেছেন। আমাদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও পৌর কর্তৃপক্ষ আমাদের ওপর কোনো সুদৃষ্টি দেয়নি। বরং আমাদেরকে মনোগ্রাম নবায়ন না করে নতুন করে মনোগ্রাম দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। তারই প্রেক্ষিতে আজকে আমাদের এই আন্দোলন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ