
দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে ঘাড়ে ব্যথা, পেশিতে টান ও অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে স্ক্রিন দেখার অভ্যাস ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তবে সঠিক ভঙ্গিতে বসা, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং কিছু সহজ ব্যায়ামের মাধ্যমে এ ধরনের অস্বস্তি কমাতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে লন্ডনের কুইন্স হাসপাতালের নিউরোসার্জন অ্যান্থনি ঘোষের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মাথা স্বাভাবিক অবস্থায় সোজা রাখলে ঘাড়ের ওপর প্রায় ৫ দশমিক ৪ কেজি ওজনের সমপরিমাণ যান্ত্রিক চাপ পড়ে। কিন্তু মোবাইল বা ল্যাপটপের দিকে তাকাতে মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখলে সেই চাপ বেড়ে প্রায় ২৭ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
দীর্ঘ সময় ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকার ফলে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, ব্যথা এবং স্বাভাবিক নড়াচড়ায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঘাড়ের টিস্যুর নমনীয়তা কমে যাওয়া, মেরুদণ্ডের ডিস্কে ক্ষয় এবং অস্থিসন্ধিতে পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। তবে বয়সজনিত পরিবর্তন থাকলেই যে ঘাড়ে ব্যথা হবে, এমন নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘাড়ের যত্নে নিয়মিত নড়াচড়া করা, স্ক্রিন ব্যবহারের মধ্যে বিরতি নেওয়া এবং পেশির শক্তি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ঘাড়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া ও অস্বস্তি কমাতে পাঁচটি সহজ ব্যায়াম করা যেতে পারে।
১. ডানে-বাঁয়ে ঘাড় ঘোরানো
চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন অথবা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ুন। এরপর ধীরে ধীরে মাথা একদিকে ঘোরান। যতটুকু ঘোরালে স্বস্তি বোধ করেন, ততটুকু ঘুরিয়ে প্রায় দুই সেকেন্ড ধরে রাখুন। এরপর মাথা মাঝখানে ফিরিয়ে অন্যদিকে একইভাবে ঘোরান। প্রতিটি দিকে দুই থেকে তিনবার ব্যায়ামটি করা যেতে পারে। ব্যথা বা অস্বস্তি বাড়লে জোর করে মাথা ঘোরানো যাবে না।
২. সঠিক ভঙ্গিতে বসার অভ্যাস
ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ওপর চাপ কমাতে বসার ভঙ্গি ঠিক রাখা জরুরি। চেয়ারে বসার সময় পিঠ ও কাঁধ শিথিল রাখুন এবং ঘাড় সোজা রাখার চেষ্টা করুন। থুতনি সামনে এগিয়ে দেওয়া কিংবা কাঁধ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখা এড়িয়ে চলুন। কম্পিউটারে কাজ করা বা টেলিভিশন দেখার সময় দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে না থেকে নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করুন। বিরতির সময় অল্প হাঁটাচলা বা হালকা নড়াচড়া করুন।
৩. সামনের দিকে ঝুঁকে থাকা মাথার ভঙ্গি ঠিক করা
দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারে মাথা ও থুতনি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এ অভ্যাস সংশোধনে ঘাড় লম্বা রেখে থুতনি ধীরে ধীরে পেছনের দিকে টেনে নিন। একই সঙ্গে বুক সামান্য প্রসারিত করুন এবং দুই কাঁধ আলতোভাবে পেছনে রাখুন। এতে মাথা ও ঘাড়কে কাঁধের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সঠিক অবস্থানে রাখতে সহায়তা হতে পারে।
৪. ঘাড়ের সামনের পেশি শক্তিশালী কর
মাথাকে স্থিতিশীল রাখা ও এর ভার বহনে ঘাড়ের সামনের পেশিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ব্যায়ামের জন্য চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করুন এবং পায়ের পাতা মেঝে বা বিছানায় রাখুন। এরপর থুতনি আলতোভাবে বুকের দিকে টেনে মাথা সামান্য ওপরে তুলুন। কয়েক সেকেন্ড ধরে রেখে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসুন। তবে ঘাড়ে আগে থেকেই সমস্যা থাকলে এ ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
৫. ঘাড়ের গভীর পেশির শক্তি বাড়ানো
পেছনে ঠেস দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, এমন চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন। সামনের দিকে তাকিয়ে থুতনি আলতোভাবে পেছনে টানুন। এরপর মাথার পেছনের অংশ চেয়ারের ঠেসের সঙ্গে হালকাভাবে চাপ দিন। কিছুক্ষণ এ অবস্থায় থেকে আবার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে আসুন। স্বস্তি অনুযায়ী কয়েকবার ব্যায়ামটি করা যেতে পারে। ঘাড়ের পেশি শক্তিশালী করতে রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডও ব্যবহার করা যায়, তবে সঠিক কৌশল জানা না থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করা উচিত নয়।
ঘাড়ের ওপর চাপ কমাতে কাজের জায়গার ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। কম্পিউটারের স্ক্রিন চোখের কাছাকাছি উচ্চতায় রাখা, দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে মোবাইল না দেখা এবং নিয়মিত বিরতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তবে ঘাড়ে দীর্ঘস্থায়ী, তীব্র বা ক্রমশ বাড়তে থাকা ব্যথা হলে শুধু ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। ব্যথার সঙ্গে হাত-পায়ে অসাড়তা, পেশির দুর্বলতা বা অন্য কোনো উদ্বেগজনক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ব্যায়াম করার সময় ব্যথা বাড়লে তা বন্ধ করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি