
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০১১ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মকর্তার ক্যাডার পরিচয় ও নিয়োগের বৈধতা নিয়ে আইনি বিরোধের জেরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি প্রক্রিয়া থমকে আছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ও নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা গেছে, ২০১১ সালে পিএসসি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়। এতে শতাধিক আবেদন জমা পড়লেও ১৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১১ জন ২০১২ সালে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে যোগ দেন। তবে পরবর্তী সময়ে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের ক্যাডার পরিচয় ও পদোন্নতি নিয়ে বিরোধ শুরু হয়।
বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের দাবি, ২০১১ সালে সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নন-ক্যাডার। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও নিয়ম অনুসরণ না করেই ওই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে। অন্যদিকে, ২০১১ সালে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের দাবি, পিএসসির মাধ্যমে তাদের ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের নিয়োগে কোনো অবৈধতা প্রমাণিত হয়নি।
বিরোধের প্রভাব পড়েছে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতিতেও। ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তারা নিজেদের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের আশঙ্কা করছেন।
অন্যদিকে, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের নিয়োগের বিষয়ে পিএসসি, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন চিঠিতে নিয়মের বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। আদালতে একের পর এক রিটের কারণে তাদের পদোন্নতি আটকে আছে বলেও দাবি করেন তারা।
গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে রিজার্ভসহ মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে ১১টি। বর্তমানে সাতজন কর্মকর্তা এ পদে কর্মরত। প্রেষণে পদায়ন, পদোন্নতি ও নতুন পদ সৃজনের কারণে মাঠপর্যায়ে তিনটি পদ শূন্য রয়েছে।
ওই চিঠিতে সরকারি কাজের স্বার্থে শূন্য তিনটি পদ জরুরি ভিত্তিতে পূরণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়। এ জন্য তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার জন্য নামও পাঠানো হয়েছিল। তবে আদালতে রিট ও মামলা জটিলতার কারণে সেই প্রক্রিয়াও এগোয়নি।
বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোর্শেদ ইকবাল বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নন-ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের ক্যাডার পরিচয় দেওয়া বৈধ নয়। সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই তারা পদোন্নতির চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, ২০১১ সালে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া এবং বর্তমানে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত মো. জিয়াউর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম ও সমীরণ মিস্ত্রী বলেন, পিএসসি তাদের বিসিএস ক্যাডার প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি জটিল। তার ভাষ্য, বিসিএস (গণপূর্ত) নামে স্বতন্ত্র ক্যাডার থাকায় সেখানে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগের বিধান রয়েছে। সেই কাঠামোর বাইরে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এক ধাপ ওপরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা ছাড়া পদোন্নতির সুযোগ নিয়েও আইনি জটিলতা রয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মাদ সারওয়ার জাহানও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দীর্ঘদিনের এই বিরোধ ও মামলা জটিলতায় একদিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর শূন্য পদ পূরণ করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে পদোন্নতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে জনবল থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি