
ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে করা চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চুক্তিটির কাঠামো, মার্কিন সরকারি সংস্থার ক্ষমতা, ভেনেজুয়েলার তেল আইন এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে অংশীদারত্ব পাবে এবং ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর সেই অংশীদারত্ব কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ তৈরি করবে—তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
চুক্তির কাঠামো কী
আগস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলার বেসরকারি তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের (এনএবিইপি) ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসবে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি প্রমাণিত তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ’ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব সরাসরি শেয়ার মালিকানার বদলে ‘পেনি ওয়ারেন্ট’ কাঠামোয় রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট শর্তে ভবিষ্যতে কোম্পানির শেয়ার কেনার অধিকার থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের।
চুক্তির আরেকটি অংশ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উৎপাদিত তেলের একটি অংশ উৎপাদনমূল্যে কেনার সুযোগ পাবে। এর সঙ্গে মার্কিন কৌশলগত তেল মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ পুনর্গঠনের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।
তেল নিয়ে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের অবস্থান
বিদেশি দেশের তেলসম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ধারণা ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যে বহু বছর ধরেই এসেছে। ভেনেজুয়েলায় সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর দেশটির তেলশিল্পকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগে ওয়াশিংটনের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জানুয়ারিতে মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর ভেনেজুয়েলায় ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব নেয়। এরপর ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেয় নতুন সরকার।
চুক্তির কেন্দ্রে বেতানকুর্ত
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভেনেজুয়েলান ব্যবসায়ী আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ত লোপেজ। এনএবিইপির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে তার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তবে তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে অতীতে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডে তদন্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া বা তাকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার তথ্য নেই। তার আইনজীবীরা অতীতের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বেতানকুর্তের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি।
পেন্টাগনের অংশীদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর বা তার অধীন কোনো দফতর আদৌ বিদেশি একটি বেসরকারি তেল কোম্পানিতে অংশীদারত্ব নিতে পারে কি না।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন অংশীদারত্বটি পেন্টাগনের অধীন কাঠামোর মাধ্যমে ‘পেনি ওয়ারেন্ট’ হিসেবে রাখা হচ্ছে। তবে মার্কিন সরকারি সংস্থার এ ধরনের বিনিয়োগের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই কাঠামোর মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনর্গঠন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব হবে।
১০০ বছরের চুক্তি নিয়ে বিতর্ক
চুক্তির সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি মেয়াদ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি অধিকার বা ১০০ বছর পর্যন্ত ব্যবহারের কথা উঠে এলেও ভেনেজুয়েলার আইন অনুযায়ী তেল উন্নয়ন চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছরের বেশি হতে পারে কি না, তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার সরকারের পক্ষ থেকেও চুক্তিটির মেয়াদ ২৫ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোটি কীভাবে দেশটির বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দ্রুত তেল উৎপাদন বাড়ানো কতটা সম্ভব?
ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানো। তবে দেশটির তেল অবকাঠামো দীর্ঘদিনের সংকট ও বিনিয়োগ ঘাটতিতে ক্ষতিগ্রস্ত।
রয়টার্স জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন তেলক্ষেত্র উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ, নতুন অবকাঠামো এবং সময় প্রয়োজন হবে।
ফলে চুক্তি কার্যকর হলেও যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত বা বাজারে এর বড় প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
চুক্তির অস্বচ্ছতা, ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বেতানকুর্তের ব্যবসায়িক অতীত—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মার্কিন প্রশাসনে পরিবর্তন এলে চুক্তিটির ধারাবাহিকতা কী হবে, সেটিও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিটিকে দেশটির তেলশিল্প পুনরুজ্জীবন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছে।
সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি, নাকি বড় চ্যালেঞ্জ?
ট্রাম্পের ঘোষণায় চুক্তিটি ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও বাস্তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে একাধিক বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে চুক্তির আইনি বৈধতা, মার্কিন সরকারি সংস্থার অংশীদারত্বের কাঠামো, ভেনেজুয়েলার তেল আইন, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থ—দুই দিক থেকেই চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিপুল মজুতের ওপর অধিকার বা অংশীদারত্ব তৈরি হওয়া এবং সেই তেল দ্রুত উত্তোলন ও বাজারজাত করা এক বিষয় নয়। ফলে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারণে সামনে আরও কয়েকটি আইনি ও বাস্তবিক ধাপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ