
হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে ইরানের দেওয়া সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান নতুন করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার একটি রূপরেখা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তা নাকচ করে দেন। শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
ইরানের প্রস্তাব এমন সময়ে সামনে এলো, যখন কয়েক দিন আগেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছিলেন। ফলে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কোন দিকে এগোয়, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরানের সাত দিনের প্রস্তাবে কী ছিল
ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রকে গত ১৭ জুনের ব্যর্থ ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের জব্দ করা ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড়, ইরানের ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া।
এ ছাড়া সাত দিনের মধ্যে সব ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের কথাও জানিয়েছে তেহরান। এর আওতায় লেবাননে চলমান সংঘাতও রয়েছে। ইসরায়েল এখনও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় অবস্থান করছে।
আরাগচির হিসাব অনুযায়ী, ইরানের শর্তগুলো পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে। এরপর সপ্তম দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ নিয়ে আলোচনা শুরু করা সম্ভব।
তবে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে ইরানের প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে বলে জানান তিনি। আরাগচি বলেন, এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এবং ইরান চাপ, হুমকি বা ভয় দেখানোর কাছে নতি স্বীকার করবে না।
ওয়াশিংটনের অবস্থান
ইরানের প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন সরকার এখনো প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রস্তাবটি তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্পের সংশয় রয়েছে। ট্রাম্পের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে ইরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করবে না। ফলে দুই দেশের মধ্যে অচলাবস্থা আরও জটিল হয়েছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, ইরানের প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটন কোনো তাড়াহুড়ো করছে না। বরং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী মনে করছে।
এর মধ্যেই শুক্রবার রাতে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। সেখানে হরমুজ প্রণালিকে ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এর আগে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। এমনকি প্রণালিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার হুমকিও দিয়েছিলেন। ইরান অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে প্রণালিটির ওপর নিজেদের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ থাকার কথা জানিয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনা কি বন্ধ হয়ে গেছে?
অচলাবস্থার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে কাতার দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে মধ্যস্থতা করছে। উভয় পক্ষই জানিয়েছে, কূটনীতির পথ এখনও খোলা রয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুক্রবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এতে উত্তেজনা কমানো এবং নতুন করে সংলাপ শুরুর সম্ভাব্য শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর আগে নিউইয়র্কে মার্কিন বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফসহ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। ওই বৈঠককে ট্রাম্প ‘খুব ভালো’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
তবে আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস ওয়ারিকের মতে, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার জায়গা এখনো স্পষ্ট নয়। তার ধারণা, আরাগচির প্রস্তাবের মাধ্যমে আরও আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং ওয়াশিংটন কোন শর্তে সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত, সেটিও স্পষ্ট হতে পারে।
এরপর কী হতে পারে
বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ফের বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে উদ্ধৃত মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বোমা হামলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে ট্রাম্প চুক্তি না হলে ইরানকে ‘ধ্বংস’ করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। একই সময়ে তিনি আবার বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই সংঘাতের অবসানে একটি চুক্তি হতে পারে।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ট্রাম্প প্রতিকূল শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে চান না। নভেম্বরের নির্বাচনের ফলাফলও পরবর্তী মার্কিন নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে একতরফা পদক্ষেপ বা সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে এমন কোনো সমঝোতার উদ্যোগও আসতে পারে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি আত্মসমর্পণকারী হিসেবে উপস্থাপন না করা হয়।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থার কেন্দ্রে এখন হরমুজ প্রণালি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান সাত দিনের মধ্যে নৌপথটি পুনরায় চালুর প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণে আগ্রহ দেখায়নি। তবে একই সময়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এ অবস্থায় সামনে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কিংবা নতুন করে সামরিক উত্তেজনা—তিন ধরনের পরিস্থিতিই আলোচনায় রয়েছে। পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে দুই দেশের শর্ত, কূটনৈতিক উদ্যোগ, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির ওপর।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ