
দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল—সব জায়গার মানুষের কাছে সহজলভ্য, মানসম্মত ও প্রয়োজনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। তাঁর প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য রূপকল্পে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, মানুষের ঘরের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া, রোগ প্রতিরোধে জোর দেওয়া এবং স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রোববার রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত ‘স্বাস্থ্য উদ্ভাবন সবার জন্য’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, দেশের ৯০ হাজারের বেশি গ্রামের প্রতিটি মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য থাকা উচিত। বিশেষ করে ডেঙ্গু বা হামসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষকে চিকিৎসার জন্য যেন দূরবর্তী এলাকায় ছুটতে না হয়, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
জুবাইদা রহমানের মতে, স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক রাখলে হবে না। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি পর্যায়ে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, পরামর্শ, ওষুধ সরবরাহ এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।
স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে তিনি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এসব কর্মী কমিউনিটি পর্যায়ে রোগের স্ক্রিনিং, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং রোগী রেফারেলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ নারীদের জন্য বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হৃদরোগ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের ওপরও জোর দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। রোগ শনাক্ত হওয়ার পর রোগীকে নিশ্চিত রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, ওষুধ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। গর্ভাবস্থার জটিলতা, বিশেষ করে প্রি-এক্ল্যাম্পশিয়ার মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেশের রক্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর প্রস্তাবে স্বেচ্ছায় রক্তদান, নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ, সংক্রামক রোগের পরীক্ষা, রক্তের উপাদান পৃথকীকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের পাশাপাশি রক্তদাতা থেকে রোগী পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ট্র্যাক করার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাবও দেন জুবাইদা রহমান। তাঁর মতে, মানুষের আয়, সামাজিক অবস্থান বা বসবাসের এলাকার ওপর স্বাস্থ্যসেবার মান নির্ভর করা উচিত নয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতে উদ্ভাবন বলতে শুধু ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরঞ্জাম বা নতুন কোনো অ্যাপ তৈরি বোঝায় না। মানুষের বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে পারে—এমন উদ্ভাবনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য গবেষণা, প্রযুক্তি, নীতিনির্ধারণ, ওষুধশিল্প, চিকিৎসাসেবা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
সবশেষে রোগীর প্রয়োজন ও অধিকারকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান জুবাইদা রহমান। তাঁর প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আগেভাগে রোগ শনাক্তকরণ, বাড়ির কাছাকাছি চিকিৎসা, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যব্যয়ের আর্থিক ঝুঁকি থেকে পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি