
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খলা রোধ, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং জনপরিসরে নৈতিক অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধ করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনোভাবেই মুক্তচিন্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা সাংবাদিকদের দমন করার উদ্দেশ্যে কোনো আইন করা হচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী।
আন্দালিভ রহমান বলেন, অতীতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে দমিয়ে রাখার ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমের ওপর আইনের অপব্যবহারের সেই প্রবণতা সম্পর্কে বর্তমান সরকার অত্যন্ত সতর্ক। তাই নতুন খসড়া আইনে এমন কোনো দ্ব্যর্থবোধক বা অস্পষ্ট শব্দ রাখতে চায় না, যা ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমের ওপর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বাকস্বাধীনতার নামে বিভিন্ন অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন গালিগালাজ, সাইবার বুলিং এবং কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কর্মকাণ্ড সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সামাজিক অবক্ষয় রোধের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা—এই দুটি বিষয়কে কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, কেবল কঠোর আইন করে সব ধরনের অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। সাইবার স্পেসে কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে মানহানিকর তথ্য বা পোস্ট শেয়ার করাও যে আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে।
এর আগে পরামর্শ সভার সূচনা বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাইবার সুরক্ষা সংশোধন আইন চূড়ান্ত করার আগে তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মতামত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষার স্বার্থে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ ও মতামত গ্রহণ জরুরি। এ কারণেই গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি আইনের ভাষা মাঠপর্যায়ে কীভাবে কাজ করে এবং কোথায় অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে, তা গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাইবার সুরক্ষা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরস্পরবিরোধী না হয়ে একে অপরের পরিপূরক হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণমাধ্যম সম্পাদকদের আশ্বস্ত করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে না। প্রিন্ট মিডিয়ার উদ্বিগ্ন হওয়ারও কারণ নেই। আইনের কোনো জায়গায় অস্পষ্টতা বা জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্টদের মুক্তভাবে পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি এবং বলেন, এসব মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাইবার সিকিউরিটি আইনের সংশোধন প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনটির যেন অপব্যবহার না হয়, সে বিষয়েও সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশেও অনলাইন জালিয়াতি, সেক্সটোরশন, নারীদের ব্ল্যাকমেইলিং এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো অপরাধ প্রতিরোধে একটি যুগোপযোগী আইনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করে খসড়া পরিমার্জনের নির্দেশনা রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আইনের অপব্যবহার বা অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি না হয়।
পরামর্শ সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম বক্তব্য দেন।
সভায় প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরীও সভায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় প্রণীত নিপীড়নমূলক আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল ও সংশোধন করে বর্তমান সরকার নতুন সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক।
মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা এবং জামিন অযোগ্য ধারাগুলো বাদ দেওয়ার উদ্যোগকেও তিনি প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে নারী, শিশু ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হয়রানিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে কাদের গনি চৌধুরী আইনের পাশাপাশি নাগরিকদের সাইবার অধিকার রক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন। কোনো সরকারি সংস্থা নাগরিকদের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করলে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিধানও আইনে স্পষ্টভাবে রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নিয়ে খসড়া আইন নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। সভাটি সঞ্চালনা করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা। ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধিত) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করেন জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. মো. তৈয়বুর রহমান।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি