
বিশ্বে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড হয়েছে। গত আগস্ট মাসে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কোনো একটি মাসের হিসাবে এটিই এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সর্বোচ্চ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস।
কোপার্নিকাসের তাপমাত্রার তথ্য ১৯৪০ সাল থেকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এর আগে কোনো মাসে সর্বোচ্চ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। এবার সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে আগস্টের তাপমাত্রা।
ইউরোপীয় মধ্যমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের বিজ্ঞানী সামান্থা বার্গেস জানিয়েছেন, বর্তমান সময়ের মতো এত উষ্ণ পরিস্থিতি মানবজাতি সম্ভবত গত অন্তত এক লাখ বছরের মধ্যে দেখেনি।
তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত পশ্চিম ইউরোপ
এ বছর ধারাবাহিক তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানলের কারণে পশ্চিম ইউরোপে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম রেকর্ড হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা তীব্র গরমে বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে।
ইউরোপের ইউরোমোমো পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্মের হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে অতিরিক্ত গরমের কারণে ইউরোপে ৩২ হাজারের বেশি অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে।
তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও দাবানলের ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
সমুদ্রেও বাড়ছে তাপমাত্রা
শুধু স্থলভাগ নয়, বিশ্বের সমুদ্রগুলোর তাপমাত্রাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগস্টে সমুদ্রের তাপমাত্রা আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডের সমান হয়েছে। এর ফলে টানা তিন মাস ধরে বিশ্বের সমুদ্রগুলোতে রেকর্ড মাত্রার উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে।
সমুদ্রের অতিরিক্ত উষ্ণতা সামুদ্রিক প্রাণী, প্রবালপ্রাচীর ও উপকূলীয় জনবসতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। পানির তাপমাত্রার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যও নষ্ট করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এল নিনো বাড়াচ্ছে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা ও দাবানলের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনই প্রধান কারণ
বিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের অস্বাভাবিক উষ্ণতার প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন। বিশেষ করে কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রমাণ এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর মানবজাতির নির্ভরতাই জলবায়ু সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
তার মতে, কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানো অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও তাপমাত্রার নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
আগস্টের এই নতুন বৈশ্বিক তাপমাত্রার রেকর্ড আবারও বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি