
দেশের সাতটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আধুনিক রোগ নির্ণয় যন্ত্রপাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য দুটি প্যাকেজে মোট ৩৬৯ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ৩০৬ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ-সংক্রান্ত দুটি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
‘শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন (কম্পোনেন্ট-২): দেশের ৮টি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক ইমেজিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থাকলেও বর্তমান দুটি ক্রয় প্রস্তাবে সাতটি হাসপাতালের জন্য সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে। এসব সরঞ্জাম ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপন করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির মেয়াদ শুরু হয় ২০১৬ সালের ১ জুলাই এবং শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ৩০ জুন। প্রকল্পের মোট সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২০২ কোটি ৩৯ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ২৭৫ কোটি ৮৮ লাখ ৯ হাজার টাকা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ ৯২৬ কোটি ৫১ লাখ ১৮ হাজার টাকা।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিভাগীয় পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধা বাড়ানো। এর মাধ্যমে জটিল রোগ শনাক্তে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে এবং চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা বেসরকারি হাসপাতালের ওপর রোগীদের নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রথম প্যাকেজে যেসব যন্ত্র
একটি প্যাকেজের আওতায় ডিজিটাল এক্স-রে, এনজিওগ্রাফি, গ্যাস্ট্রোস্কোপি, কোলনোস্কোপি এবং প্যাক্স/রিস (পিএসিএস/আরআইএস) কেনা হবে। এ প্যাকেজের জন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (আরডিপিপি) বরাদ্দ রয়েছে ২১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
এ প্যাকেজে সর্বনিম্ন ও যোগ্য দরদাতা হিসেবে জাপানের এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে সরবরাহকারী হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত দর ২৫০ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজার জাপানি ইয়েন। নির্ধারিত বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ২০২ কোটি ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ৩০৬ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের চেয়ে কম অর্থেই প্যাকেজটির সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রথম দফায় ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ এ প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। দুটি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিলেও উভয়ের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য না হওয়া এবং জাইকার অনাপত্তি না পাওয়ায় পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়।
পরে ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট পুনঃদরপত্র প্রকাশ করা হয়। একই বছরের ১৯ নভেম্বর কারিগরি প্রস্তাব খোলা হলে এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড ও গ্রিন হাসপাতাল সাপ্লাই ইনকরপোরেটেড অংশ নেয়। কারিগরি মূল্যায়নে এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিংকে যোগ্য বা ‘রেসপনসিভ’ এবং গ্রিন হাসপাতাল সাপ্লাইকে অযোগ্য বা ‘নন-রেসপনসিভ’ বিবেচনা করা হয়।
এরপর ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জাইকার অনাপত্তি পাওয়া যায়। ২৪ মে আর্থিক প্রস্তাব খোলা হলে এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দর গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। পরে ২৯ জুলাই এ বিষয়ে জাইকার চূড়ান্ত অনাপত্তি পাওয়া যায়। এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয় জাপানের টোকিওতে।
দ্বিতীয় প্যাকেজে এমআরআই-সিটি স্ক্যান
অন্য প্যাকেজে এমআরআই, সিটি স্ক্যানার, ম্যামোগ্রাফি ও আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্র কেনা হবে। এ প্যাকেজে আরডিপিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ২১৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যয় হবে ১৬৭ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা।
এ প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ফুজিফিল্ম হেলথ কেয়ার এশিয়া প্যাসিফিক পিটিই লিমিটেড এবং ফুজিফিল্ম মিডল ইস্ট এফজেডই, দুবাইয়ের যৌথ উদ্যোগকে সরবরাহকারী হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে।
যৌথ উদ্যোগটির দর ১ কোটি ৩৭ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। নির্ধারিত বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৬৭ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এ দর সরকারি প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে কম এবং প্যাকেজের নির্ধারিত বরাদ্দের মধ্যেই রয়েছে।
এ প্যাকেজের দরপত্রে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এগুলো হলো এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড, ফুজিফিল্ম হেলথ কেয়ার এশিয়া প্যাসিফিক পিটিই লিমিটেড ও ফুজিফিল্ম মিডল ইস্ট এফজেডই, দুবাইয়ের যৌথ উদ্যোগ এবং সিমেন্স হেলথিনিয়ার্স লিমিটেড।
কারিগরি মূল্যায়নে এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ফুজিফিল্মের যৌথ উদ্যোগকে যোগ্য বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে সিমেন্স হেলথিনিয়ার্সকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পরে ২৪ মে আর্থিক প্রস্তাব খোলা হলে ফুজিফিল্মের যৌথ উদ্যোগের দর সর্বনিম্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরবিস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দর ছিল ২৫০ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজার জাপানি ইয়েন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৯৭ কোটি ৫১ লাখ ৪ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। ফুজিফিল্মের যৌথ উদ্যোগের দর ১৬৭ কোটি ১২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা হওয়ায় তাদেরই কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ফুজিফিল্মের কার্যালয় সিঙ্গাপুরে অবস্থিত।
সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রচলিত আইন, বিধি ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে জাইকার অনাপত্তিও নেওয়া হয়েছে। পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে প্রস্তাব দুটি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হয় এবং তা অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ