
ঢাকা: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারের ধরন ও পরিধিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন আচরণবিধিতে মিছিল ও পোস্টার নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি সুবিধা ব্যবহার, মাইক ও শব্দবর্ধনকারী যন্ত্রের ব্যবহার, বিলবোর্ড, নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন এবং প্রচারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও ইসির হাতে রাখা হয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে নতুন করে নির্বাচনী আচরণবিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধিমালা ইতোমধ্যে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। অন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর বিধিমালাও প্রক্রিয়াধীন। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে ২০১৬ সালের বিধিমালা বাতিল করা হচ্ছে।
মিছিল ও পোস্টার নিষিদ্ধ
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী এলাকায় পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদান দিয়ে তৈরি প্রচারপত্র, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ব্যানার বা প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
ভবন, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সরকারি ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনা, সেতু, কালভার্ট, মেট্রোরেলের পিলার ও ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারসামগ্রী লাগানো যাবে না।
এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য মিছিল করা যাবে না।
এআই কনটেন্টেও নিষেধাজ্ঞা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রেও কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। প্রার্থী বা তাঁর পক্ষের কেউ ব্যক্তিগত কুৎসা, অপমানজনক বক্তব্য, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচার করতে পারবেন না।
নির্বাচনী পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন কনটেন্ট তৈরি বা প্রচারও নিষিদ্ধ। একইভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারের সুযোগ রাখা হয়নি। জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, লিঙ্গ বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে উসকানিমূলক বক্তব্যও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভোটার স্লিপ বিতরণে সীমা
ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ভোটার স্লিপ বিতরণ করা যাবে না। স্লিপে প্রার্থীর নাম, ঠিকানা, প্রতীক ও ভোট দেওয়ার সময়সংক্রান্ত তথ্য থাকতে পারবে।
তবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম, ছবি বা প্রতীক এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না, যাতে ভোটার বিভ্রান্ত হন।
দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাইক
নির্বাচনী প্রচারে মাইক বা শব্দবর্ধনকারী যন্ত্র ব্যবহারের সময়ও নির্ধারণ করে দিয়েছে ইসি। দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর মাইক ব্যবহার করে প্রচার করা যাবে না।
প্রচারে ব্যবহৃত মাইক বা শব্দবর্ধনকারী যন্ত্রের শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে রাখতে হবে। একই ওয়ার্ডে একটির বেশি মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
সরকারি সুবিধা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। প্রার্থীর পক্ষে সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্র বা অন্য কোনো সরকারি সুবিধা ব্যবহারও নিষিদ্ধ।
কোনো প্রার্থীর পক্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে প্রার্থী ছাড়া কোনো স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিও নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
বিলবোর্ড ও যানবাহনে কড়াকড়ি
নির্বাচনী প্রচারে বিলবোর্ড ব্যবহার করা গেলেও এর আকার ও সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ ১৬ ফুট বাই ৮ ফুট আকারের বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। একজন প্রার্থী প্রতি ওয়ার্ডে একটির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
বিলবোর্ড এমনভাবে স্থাপন করা যাবে না, যাতে জনসাধারণের চলাচল, যানবাহন চলাচল বা পরিবেশের ক্ষতি হয়।
অন্যদিকে প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহার নিষিদ্ধ। ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে মিছিল বা শোভাযাত্রাও করা যাবে না। নির্বাচনের দিন ভোটার আনা-নেওয়ার জন্য কোনো যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ
নতুন আচরণবিধিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে কোনো মাধ্যমে প্রচার চালানো হবে, সে বিষয়ে আগে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে তথ্য দিতে হবে।
এ ছাড়া নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। সভা আয়োজনের ক্ষেত্রে পুলিশের পূর্বানুমতি এবং ঘরোয়া সভার নির্ধারিত বিধানও প্রার্থী ও সমর্থকদের মেনে চলতে হবে।
পেশিশক্তির ব্যবহার, কুৎসা রটানো, ধর্মের অপব্যবহার এবং স্কুল-কলেজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আচরণবিধি ভাঙলে প্রার্থিতা বাতিল
আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনো রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশনের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে কোনো মেয়র বা কাউন্সিলর প্রার্থী কিংবা তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছেন, তাহলে কমিশন বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে ইসি।
লঙ্ঘনে জেল-জরিমানা
আচরণবিধির কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ইসি জানিয়েছে, আগামী নভেম্বরের শেষার্ধ থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ায় আচরণবিধিও ভিন্ন ছিল। এখন নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে। তাই নতুন করে আচরণবিধি প্রণয়ন করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভোটের সময় কোনো অসুবিধা না হয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ