
সোনারগাঁ
শীতের শুরু হতেই ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁ আবারও ফিরে পেয়েছে তার পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য। পানাম নগর, বাংলাদেশ লোক ওই কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, বারদী, মেঘনার ঘাটসহ পুরো এলাকা এখন পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম ব্যস্ততম পর্যটন এলাকায়। প্রতিদিনই ঢল নামছে হাজারো দর্শনার্থীর। শীতকালীন আবহ এবং ছুটির দিনগুলোতে এই আগমন আরও বেড়ে বিশেষ উৎসবের আমেজ তৈরি করেছে। ঢাকার ব্যস্ত জীবন থেকে একটু স্বস্তি পেতে কিংবা পরিবারকে নিয়ে ঐতিহ্যের নগরী ঘুরে দেখতে হাজারো মানুষ ছুটে আসছে সোনারগাঁয়ে।
শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকালে পানাম নগরের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়েই দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। ইতিহাসপ্রেমী তরুণেরা ফ্রেম ধরে ফ্রেম ধরে ছবি তুলছে। ছোট ছোট শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, তাদের সঙ্গে ব্যস্ত মা-বাবারা। দম্পতিরা খুঁজছে এমন একটি কোণ, যেখানে স্মৃতির ঝরনা বন্দি করা যায়। লোকশিল্প জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে দর্শনার্থীদের লম্বা লাইন। প্রতিটি গ্যালারিতে দর্শনার্থী দেখা গেছে। একদিকে শিশুদের কৌতূহল, অন্যদিকে বৃদ্ধদের স্মৃতিচারণ -সব মিলিয়ে পুরো জাদুঘর যেন প্রাণবন্ত।
সাধারণ দিনের তুলনায় শুক্রবার ও শনিবারে দর্শনার্থীর চাপ কয়েকগুণ বেশি। শিশুদের স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় পরিবারগুলো সকালে দল বেঁধে চলে আসে সোনারগাঁ। দুপুরের দিক থেকে পানাম নগরের ভিতরে হাঁটার জায়গাও থাকে না। খাবারের দোকানগুলোয় লাইন পড়ে যায়। নদীপথও ব্যস্ত সময় পার করছে। মেঘনা নদীর ঘাটে নৌকা ভ্রমণ নিতে সপ্তাহান্তে ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি। নৌকা মালিকদের ভাষায় -এই মৌসুমই তাদের আয়ের প্রধান সময়।
দর্শনার্থীর এ ভিড় স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রেস্টুরেন্ট, খাবারের স্টল, হস্তশিল্প বাজার, রিকশা–ইজিবাইক চালক, নৌকা মালিক-সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিশেষ করে সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে আর্থিক লেনদেন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায় বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তবে পর্যটক সমাগম বাড়ায় সড়কে চাপও বাড়ে। পার্কিং সংকট, ভিড়ের কারণে চলাচলে কিছুটা ভোগান্তিও তৈরি হয়। এসব নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ছুটির দিনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখার কথা জানিয়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা-শীত জুড়ে এই দর্শনার্থীর ঢল বজায় থাকলে সোনারগাঁয়ের অর্থনীতিতে আরও গতি ফিরবে। পাশাপাশি পর্যটন সেবা বাড়ানো গেলে সোনারগাঁ দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
পানাম নগর ভ্রমণে আসা রাফি খান বলেন, ঢাকা থেকে ঘুরতে আসার জন্য এর চেয়ে কাছে, সুন্দর এবং শান্ত জায়গা আর নেই। শীতে এখানে ইতিহাস যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ঢাকার মিরপুর থেকে আসা আমিনা হক বলেন, সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, প্রকৃতি ও স্থাপত্যের মিলিত সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ। আমরা পরিবারসহ ছুটির দিন এখানে এসেছি। শীতের সময় ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা অন্যরকম হয়। এই ভ্রমণ শুধু আনন্দই দেয় না, শিশুদের জন্যও শিক্ষণীয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শাহীন বলেন, শীতের মৌসুম আমাদের জন্য বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। শুক্রবার ও শনিবারে দর্শনার্থীর সংখ্যা সাধারণ দিনের তুলনায় তিন–চারগুণ বেড়ে যায়। এ সময়ে বিক্রি এতটাই ভালো হয় যে, সারা বছরের আয়ের বড়ো অংশ আসে শুধু এই কয়েকদিনের ব্যাবসা থেকে। পর্যটকরা যদি আরও নিয়মিত ও নিরাপদভাবে আসতে পারে, তবে আমাদের ব্যাবসা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
নৌকা মালিক আব্দুল মালেক বলেন, মেঘনা নদীর নৌকা ভ্রমণ শীত মৌসুমে সবচেয়ে জনপ্রিয়। শুক্রবার ও শনিবারে প্রায় প্রতিটি নৌকা ভরা থাকে। পর্যটকরা নদীতে ভ্রমণ উপভোগ করেন আর আমাদের আয় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই সময়ের আয়ের ওপরই আমরা পুরো বছরের খরচ এবং পরিবার চালাই। পর্যটক বেশি আসায় স্থানীয় অর্থনীতি ও ছোট ব্যবসায়ও চাঙা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানাম নগরীর দায়িত্বে থাকা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টডিয়ান সিয়াম চৌধুরি বলেন, শীতের মৌসুমে পানাম নগরীতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ