
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহিরা এক পাশে উত্তাল বঙ্গোপসাগর, অন্য পাশে সাঙ্গু নদী। নদী–সমুদ্রের কোল ঘেঁষা এই উপকূলে একসময় তালগাছ ছিল প্রকৃতির অতন্দ্র প্রহরী। বজ্রপাত, ঝড়, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সবুজ দেয়াল আজ ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। সেই হারানো প্রহরীদের ফিরিয়ে আনতে এবার মানবিক উদ্যোগে ২০ হাজার তাল বীজ রোপণের মহাযাত্রা শুরু করেছে সামাজিক সংগঠন এস.এম. মানবিক ফাউন্ডেশন।
কোনো সরকারি প্রকল্প নয় নিখাদ ভালোবাসা আর দায়বোধ থেকে গ্রামকে রক্ষা করার আকুতি নিয়ে এই কাজ করছেন ফাউন্ডেশনের একঝাঁক স্বপ্নবান তরুণ। রোদ-কাদা উপেক্ষা করে হাতে কোদাল, কাঁধে বীজের বস্তা, নতুন আগামীর বীজ বুনে চলেছেন উপকূলের প্রান্ত জুড়ে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আবদু ছবুর কোম্পানি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, “অতো কিছু পারি না ভাই… শুধু চাই, আমার জন্মভূমি বাঁচুক।” তিনি জানান, ২০১৭ সালে বজ্রপাতে স্থানীয় এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী মো. ফোরকান–এর মর্মান্তিক মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় তালগাছ ফিরিয়ে আনার সংকল্প। “তাল বীজ মানে শুধু গাছ নয়— এটি আমাদের উপকূল রক্ষার প্রতিশ্রুতি,” বলতে গিয়ে তার চোখ ভিজে ওঠে।
পরিবেশবিদদের মতে, তালগাছ ঝড়ের গতি কমায়, জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা প্রশমন করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক স্রোত মাটিতে পৌঁছে দেয়— ফলে প্রাণহানি কমে। তাই তালগাছ শুধু বৃক্ষ নয়, জীবনরক্ষাকারী প্রাকৃতিক টাওয়ার।
আনোয়ারা উপজেলা উপ–সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সম্পদ তালুকদার বলেন, “এ উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সঠিক পরিচর্যায় এগুলো বড় হলে পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয় তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, বজ্রপাতের ঝুঁকিও কমবে।”
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, “ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২০ হাজার তাল বীজ রোপণ সত্যিই অনুকরণীয়। সরকার ও জনগণ একসাথে কাজ করলে পরিবেশ সুরক্ষা ও উন্নয়নে আমরা আরও এগিয়ে যাবো।”
দিন শেষে অস্তমিত সূর্যের আলোয় বীজ রোপণকারীদের মুখে ক্লান্তি নয়, ছিল প্রশান্তির হাসি। হাতে–মুখে লাগা কাদা যেন গৌরবের ব্যাজ— তারা জানে, আজ যে বীজ বোনা হচ্ছে, একদিন তা আকাশ ছুঁয়ে উপকূলকে আগলে রাখবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ এমএস