
বাজারে মুলা তোলার আগেই সব শেষ— এমন হাহাকার নিয়ে মাঠের ধান-সবজির দিকে তাকিয়ে হতাশা ভরা কণ্ঠে বলছিলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার শিয়ালবেড় গ্রামের কৃষক রাব্বানী মণ্ডল। জমির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এই যে জমি, এখন শুধু পানি আর পানি।” চোখে পানি, পায়ের নিচেও হাঁটুসমান পানি। কয়েকদিন আগেও যে জমিতে সবুজ মুলার গাছ দুলত, এখন তা থইথই বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে।
নভেম্বরের শুরুতেই দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজশাহীর পবা, মোহনপুর, বাগমারা, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার ফসলের মাঠজুড়ে দেখা গেছে একই চিত্র। শাকসবজি, ঢেঁড়স, মুলা, পেঁয়াজ, সরিষা থেকে শুরু করে কাটার অপেক্ষায় থাকা আমন ধানও পানির নিচে। কৃষি বিভাগের হিসাবে জেলার ২,১৫০ বিঘা ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা অন্তত ৪,২০০ জন। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, বাস্তব ক্ষতি এর চেয়ে অনেক বেশি।
কৃষকেরা জানাচ্ছেন, গত প্রায় চার দশকেও নভেম্বর মাসে এমন বৃষ্টি দেখেননি তারা। রাব্বানী মণ্ডল বলেন, “আষাঢ়-শ্রাবণেও এমন পানি হয় না, যে পানি এ বছর হইল। পাঁচ বিঘা জমি ডুবছে, চারদিকে পুকুর, পানি নামারও পথ নাই। আমাদের মতো গরিব কৃষকের ভরসা এখন শুধু সরকারি সহায়তা। সরকার পাশে থাকলে আবার চেষ্টা করব, না হলে কঠিন।”
পবা উপজেলার শিয়ালবেড়, পাইকপাড়া, দাদপুর, মুরারীপুর—সবখানেই একই দৃশ্য। যেখানে চোখ যায়, পানি ও কাদা। কোথাও ধান হেলে পড়েছে, কোথাও শাকসবজি পুরোপুরি পানির নিচে। পাইকপাড়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, “১২ কাঠা জমিতে শাকসবজি করছিলাম, সব শেষ। নভেম্বর মাসে এমন বৃষ্টি কই হয়?”
একই এলাকার কৃষক আব্দুর রাজ্জাক এক বিঘা জমিতে বি-৮৭ জাতের ধান তুলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অসময়ের বৃষ্টিতে ধানগাছ পড়েছে পানির নিচে। তার ছেলে সোহানুর রহমান বলেন, “ধানের অর্ধেক তো গেছে। আবার কাদায় দাঁড়িয়ে কাটতে গিয়ে শ্রমিক খরচও বেশি লাগবে। মনে হয় খরচটাও উঠবে না। তিন দিন পরে বৃষ্টি হইলে এভাবে সর্বনাশ হতো না।”
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, নভেম্বরের শুরুতে যে বৃষ্টি হয়েছে তা নিম্নচাপজনিত। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হয়েছে এবং প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে জমি শুকিয়ে দ্রুত নতুন ফসল রোপণ করতে পারেন। ইতোমধ্যে সরিষা, গম, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ বিতরণ শুরু হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “বৃষ্টিতে জেলার ২,১৫০ বিঘা জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রণোদনা এলে তা দ্রুত বিতরণ করা হবে।”
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, ঋণ করে অনেকেই চাষ করেছিলেন। এখন ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ধার শোধ কীভাবে হবে, সেই চিন্তাই বেশি। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবেই এমন অস্বাভাবিক বৃষ্টি বলে মনে করছেন অনেক পরিবেশবিদ। তাদের মতে, মৌসুমি বৃষ্টির ধরন বদলে যাওয়ায় কৃষিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ এমএস