
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং এ সম্পর্ক কোনো বিদেশি শক্তির নির্দেশনায় পরিচালিতও হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীন ও আত্মনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি প্রশংসনীয়, যা সব সময়ই দেশের নিজস্ব নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক: এগিয়ে যাওয়ার পথ’ শীর্ষক এ আয়োজনে প্রধান বক্তা ছিলেন রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে সাবেক রাষ্ট্রদূতদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ফরমার অ্যাম্বাসেডরস (AOFA)।
ইয়াও ওয়েন বলেন, গত ৫০ বছরে পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় অংশীদার হিসেবে চীন সব সময় সহযোগিতা করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও এ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। সার্ক অকার্যকর হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ–চীন–পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিদেশীয় সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ তার নিজস্ব শক্তি ও নীতিতে বিশ্বাসী। এ দেশের পররাষ্ট্রনীতি কখনও বিদেশি শক্তির ইশারায় পরিচালিত হয়নি। আমরা চাই বাংলাদেশ নিজস্ব অবস্থান থেকে তার নীতি অনুসরণ করুক, এ ব্যাপারে চীন সম্পূর্ণ সমর্থন জানায়।”
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক মূলত জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থে গড়ে উঠেছে। “এই সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে জনগণের কল্যাণ,” তিনি বলেন।
ইয়াও ওয়েন আরও উল্লেখ করেন, “প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি চীন সফর করেছে। তারা সবাই দুই দেশের সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও জোরদারের পক্ষে মত দিয়েছেন—এটাই আমাদের সম্পর্কের শক্তি।”
রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, “বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে গড়ে উঠেছে। এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং কোনো বাহ্যিক প্রভাবেও পরিচালিত হবে না। নির্বাচনের পরও দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর ও টেকসই হবে।”
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘোষিত বৈশ্বিক সুশাসন উদ্যোগ (GGI) প্রসঙ্গে ইয়াও ওয়েন বলেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কিছু দেশ এককভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করছে। এর ফলে উন্নয়নশীল ও দক্ষিণের দেশগুলো চীনের দিকে ঝুঁকছে। চীন আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় ও বৈশ্বিক সুশাসনে নেতৃত্ব দিতে চায়, যাতে পৃথিবী ‘জঙ্গলের আইন’-এর হাতে না পড়ে।”
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে চীনের ভূমিকা সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত বলেন, “বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশই আমাদের মধ্যস্থতার অনুরোধ জানিয়েছে। চীন সমাধানের চেষ্টা করেছে, কিন্তু এটি জটিল সংকট যেখানে অনেক স্টেকহোল্ডার জড়িত। কিছু দেশ ও সংস্থা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছে। তাই সকল পক্ষের সহযোগিতায়ই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।”
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ইয়াও ওয়েন বলেন, “এই প্রকল্পের প্রস্তাব এসেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আমরা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকেন্দ্রিক দুটি ধাপে প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তবে দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, এবং চীন এখন এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি ডলার, এবং সম্পন্ন হতে ৭–৮ বছর লাগবে।”
রাষ্ট্রদূত জানান, “চট্টগ্রামে চীনের অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে আমরা কঠোর পরিশ্রম করছি। প্রয়োজনীয় নথিপত্র স্বাক্ষরের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে, আশা করছি নভেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০টি চীনা প্রতিষ্ঠান ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।”
ইয়াও ওয়েনের ভাষায়, “বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক জনগণের স্বার্থে, আঞ্চলিক শান্তি ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে। এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়—বরং ভবিষ্যতের উন্নয়নের জন্য।”
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ