
কীটনাশকেই শেষ সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি
বিষেই (কীটনাশক) শেষ হতে চলেছে সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি। বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা ম্যানগ্রোভ এই বনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার থামছেনা। এখন তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শুধু পূর্ব সুন্দরবন বিভাগেই গত চার মাসে বিভিন্ন অভিযানে জেলেদের আটকসহ বিষের বোতল ও বিষ দিয়ে আহরণ করা বিপুল পরিমাণ মাছ জব্দ করা হয়েছে। সুন্দরবন বিভাগ ও পরিবেশবাদীরা বলছেন, এক শ্রেনীর জেলে বিষ দিয়ে মাছ আহরণের ফলে শেষ হয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ। ডলফিনসহ জলজপ্রাণীসহ পাখি ও বন্যপ্রাণী ও ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের শ্বাসমূল ও চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের তথ্যমতে, তালিকাভুক্ত ৫ হাজার ৮০০ জেলে সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের অনুমোদিত নদীখালে পাশ-পারমিট নিয়ে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে থাকে। সুন্দরবনের নদীখালে বিষ দিয়ে মাছ আহরণ সস্পূর্ন নিষিদ্ধ হলেও দাদনের জালে আটকে থাকা অধিকাংশ জেলেরা লোকালয়ে তাদের মহাজন ও আড়তদারদের সরবরাহকৃত বিষ খালের পানিতে ছড়িয়ে দিয়ে মাছ আহরণ করে থাকে। নিষিদ্ধ কীটনাশক সহজলভ্য হওযায় ওই বিষ ব্যবহার করে সুন্দরবনে মাছ মারা হচ্ছে। মহাজন ও দাদনদারদের চাপেই দরিদ্র জেলেরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও অধিক মাছ প্রাপ্তির আশায় বিষ দিয়ে মাছ ধরে। এতে করে শেষ হয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদ। ডলফিনসহ জলজপ্রাণী, পাখি, বন্যপ্রাণী ও ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। গত জুন থেকে সেপ্টেম্বর এই চার মাসে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় আড়াই শত অভিযানে ১৩২ জন অপরাধীকে আটক করেছে বনরক্ষীরা। জেলেদের কাছ থেকে এসময় জব্দ করা হয়েছে ৪৫াট বিষ ভর্তি বোতল, ৪ কেজি বিষ পাউডার, ৬৫৭ কেজি বিষযুক্ত মাছ। বিষ দিয়ে ধরা মাছের ২২ বস্তা শুটকি , ৩৭৫ কেজি কাঁকড়া, ২৪২টি ট্রলার ও নৌকা, প্রায় ২০ হাজার ফুট মাছ ধরা জাল।
মোংলার উপজেলার জয়মনি এলাকার রনজিৎ মন্ডল নামে এক জেলে জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামগুলোর বেশির ভাগ জেলে মহাজনের দাদনের জালে আটকানো। অনেক সময় বাধ্য হয়েই তারা বিষ দিয়ে মাছ শিকার করে। মহাজনরা বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে ভারতীয় কিটনাশক এনে দেয়, কিছু খুলনা থেকেও আনা হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় বেকার হয়ে পড়া বা ঋণে জর্জরিত জেলেরা পেটের দায়ে এই পথে নামতে বাধ্য হয়। বিষ দিয়ে ধরা মাছ বা চিংড়ি সরাসরি বাজারে আনা হয় না। বনেই গাছ কেটে মাচা বানিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। শুঁটকি শুকাতে সুন্দরী গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়, এতে শুঁটকির রং লালচে হয় এবং দামও বেশি পাওয়া যায়।
শরণখোলা উপজেলার গাবতলা গ্রামের জেলে আ. সাত্তার বলেন, প্রকৃত জেলেরা কখনোই সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করে না। কিন্তু কিছু অসাধু জেলে খালগুলোতে বিষ দিয়ে মাছ ধরে। তাদের পেছনে থাকে মহাজনরা। মহাজনরা দাদন দিয়ে জেলেদের ফাঁদে ফেলে এবং নিজেরাই ভারতীয় কিটনাশক সরবরাহ করে। সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরলে অনেক সময় আমাদের আটক হয়ে কারাগারে যেতে হয়। তবে, বিষ সরবরাহকারী মহাজনরা থেকে যায় ধরাছোয়ার বাইরে।
সুন্দরবন নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, বিষ দিয়ে মাছ শিকার শুধু সুন্দরবনের মৎস্য সম্পদই নয়, বনের পানি ভয়াবহভাবে দূষিত হয়ে ডলফিন, জলজপ্রাণীসহ পাখি ও বন্যপ্রাণী ও ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের শ্বাসমূল ও চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বিষ দিয়ে আহরণ করা মাছ খেয়ে মানুষের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। মূলত মহাজন ও আড়তদারদের চাপে জেলেরা এ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। সুন্দরবন বিভাগের কাছে আহরিত মাছে বিষ আছে কি না তা সনাক্তের কোন কিট না থাকায় অধিকাংশ সময়ই জেলেরা পার পেয়ে যাচ্ছে। সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতি রক্ষায় আহরিত মাছে বিষ সনাক্ত করতে বন অধিদপ্তরের কাছে দ্রুত কিট সরবরাহের দাবি জানান এই পরিবেশবিদ।
বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা ঠেকাতে আমরা ইতোমধ্যে ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছি। এতে হরিণ শিকারীদের কার্যক্রম কমে এসেছে। সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ে সয়লাভ হয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ কীটনাশকের বিষয়ে ইতিমধ্যে আমরা কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, যাতে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কীটনাশক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়। সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা পেলে সুন্দরবনকে বিষদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বাগেরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, বাগেরহাটের সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলা ও শরণখোলা উপজেলা এলাকায় কীটনাশক বিক্রি করা ডিলারদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ দুই উপজেলায় তালিকাভুক্ত প্রায় ৪০ জন কীটনাশক বিক্রেতা রয়েছে। যেসব ডিলার অবৈধ ভাবে সুন্দবনের জেলে, আড়তদার ও মহাজনদের কাছে বিক্রি করছে তাদের সনাক্ত করে কীটনাশকের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এবিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ নিয়াজ